বানোয়াট হাদিস ও শয়তানের মাইক

বানোয়াট হাদিস ও শয়তানের মাইক

ইমাম বুখারি যখন হাদিস সংকলন করেন, তখন প্রায় ৬ লক্ষ হাদিস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলেন। এ ঘাঁটাঘাঁটির কারণ হলো, তিনি অন্ধ ছিলেন না। যদি অন্ধ হতেন, তাহলে এই ৬ লক্ষ হাদিসকেই বিশ্বাস করতেন শুদ্ধরূপে, এবং স্থান দিতেন তাঁর সহিহ বুখারি শরীফে। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এই ৬ লক্ষ হাদিসের সত্যতা সম্পর্কে। সন্দেহ থেকেই উদ্ভব ঘটে পরীক্ষা-নিরীক্ষার। কোনো কথা সত্য না মিথ্যা, তা যাচাই করার প্রথম ধাপ হলো ওই কথাটিকে সন্দেহ করা।

তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান, মাত্র সাড়ে ৭ হাজার হাদিস সঠিক। বাকি ৫ লক্ষ ৯২ হাজার হাদিসের অধিকাংশই বানোয়াট। কোনো কোনোটি হয়তো বানোয়াট নয়, সহিহ, কিন্তু হাদিসটি এমনভাবে বর্ণিত যে, এগুলোর সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। একইরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলও করেছিলেন। তিনি অবশ্য সাড়ে ৭ হাজারের বদলে, ৩০ হাজার হাদিসকে সঠিক হিশেবে উল্লেখ করেছিলেন, এবং বাকি ৫ লক্ষ ৭০ হাজার হাদিসকেই সহিহ নয় বলে বাতিল করেছিলেন।

এর কারণ কী? কেন এতো বিপুল সংখ্যক হাদিসকে বাদ দিতে হয়েছিলো? এর কারণ হলো, বাংলাদেশে যারা ইসলামি ওয়াজের নামে নানা বানোয়াট ও অসত্য কথা ছড়ায়, তারা বিভিন্নরূপে ইসলামের সব যুগেই ছিলো। আমি তাদের নাম দিয়েছি— শয়তানের মাইক। ইউটিউব-ফেসবুক তখন ছিলো না, কিন্তু এক কান দুই কান হয়ে অনেক বানোয়াট কথা, হাদিসের আদলে মানুষের মনে ঠিকই গেঁথে যেতো। এখনকার মতো তখনও, মুসলিমদের ভেতর একটি অংশ ছিলো যারা পড়াশোনা করতে চাইতো না। তারা কোরআন তেলাওয়াত করতো, কিন্তু এর অর্থ ও তাফসির খতিয়ে দেখতো না। ইসলামের নামে যা শুনতো তাই তারা বিশ্বাস করতো। এ সরল বিশ্বাসীরাই ছিলো এসব বিপুল সংখ্যক বানোয়াট হাদিসের লক্ষ্যবস্তু।

হাদিস পাঁচ প্রকার। এক— সহিহ হাদিস। সহিহ মানে আসল, বা বিশুদ্ধ, বা যার সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। যেমন ইমাম বুখারির সংকলন করা ৭ হাজার হাদিসকে সহিহ হাদিস হিশেবে ধরা হয়। এর বাইরেও সহিহ হাদিস আছে। মুসলিম এবং তিরমীযি শরিফকেও সহিহ হাদিসের সংকলন বিবেচনা করা হয়। এখানে একটি ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে, সহিহ হাদিস মানে এই নয় যে এ হাদিসগুলোর প্রত্যেকটাই শতোভাগ নিশ্চয়তাযুক্ত সহিহ হাদিস। কারণ দেখা গেছে যে, ইমাম বুখারি যে হাদিসগুলোকে সহিহ হিশেবে গ্রহণ করেন নি, সেগুলোর কোনো কোনোটিকে আবার অন্য হাদিস সংকলকেরা সহিহ হিশেবে গণ্য করেছেন। সে-দিক থেকে বলতে পারি, সহিহ হাদিশ ধারণাটি একটি সাবজেক্টিভ ধারণা, ওবজেক্টিভ নয়। এটি নির্ভর করে, কে কোন হাদিসকে কীভাবে বিচার করছে সেটির উপর। কুতুব-আল-সিত্তাহ নামে যে-ছয়টি হাদিস-সংকলন আছে, সাধারণভাবে সেগুলোকেই সহিহ হাদিসের সংকলন ধরা হয়। ছয়টি সংকলন কেন? কারণ অনেকের ধারণা, ইমাম বুখারীর সংকলনের বাইরেও সহিহ হাদিস থাকতে পারে।

প্রশ্ন আসতে পারে, সহিহ হাদিস কীভাবে নিরূপণ করা হয়? এটি নিরুপণ করা হয় ‘ইসনাদ’ দ্বারা। ইসনাদ কী? ইসনাদ হলো কোনো হাদিস যারা বর্ণনা করেছেন, তাদের একটি পরম্পরা। এটি এক প্রকার ‘চেইন অব ন্যারেশন’। কোনো হাদিস সহিহ হতে হলে, এই চেইনের প্রত্যেক বর্ণনাকারীকে সৎ এবং নির্ভরযোগ্য হতে হবে। যে-ব্যক্তির মিথ্যে কথা বলার ইতিহাস আছে, তিনি যদি এই চেইনের অংশ হন, তাহলে হাদিসটি সহীহ হিশেবে গণ্য হবে না।

ধরা যাক সাহাবি ‘ক’ একটি কথা রাসূল থেকে শুনেছেন। তিনি এটিকে বর্ণনা করলেন সাহাবি ‘খ’ এর কাছে। সাহাবি ‘খ’ বর্ণনা করলেন সাহাবি ‘গ’ এর কাছে। এই ‘ক’ থেকে ‘গ’ পর্যন্ত যদি হাদিসটির বর্ণনা অবিকল থাকে, এবং প্রত্যেক বর্ণনাকারীর চারিত্রিক সততা যদি নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে হাদিসটি সহিহ হিশেবে গণ্য হবে। কিন্তু বর্ণনাকারীদের একজনের বক্তব্যের সাথে যদি আরেজনের বক্তব্যের অমিল পাওয়া যায়, তাহলে হাদিসটিকে সহিহ হিশেবে আমলে নেয়া যাবে না। আবার ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’, এঁদের একজনেরও যদি মিথ্যে বা বানোয়াট কথা বলার ইতিহাস থাকে, তাহলেও হাদিসটিকে সহিহ বলা যাবে না।

আমি এজন্যই বলি, ওয়াজ মাহফিলে যারা একটি মিথ্যে কথাও বলেন, তাদের সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে। স্লিপ অব টাং আর মিথ্যে কথা এক জিনিস নয়। স্লিপ অব টাং বা কথা বলতে গিয়ে ভুল করার সাথে, সুচিন্তিতভাবে বলা মিথ্যে কথার পার্থক্য আছে। আজহারি সাহেব যে বলেছেন— চাঁদে গিয়ে নিল আর্মস্ট্রং আজান শুনেছেন, এটি একটি সুচিন্তিত মিথ্যে কথা। মানুষ মিথ্যার আশ্রয় নেয়, আমি মনে করি পাঁচটি কারণে। প্রথমত, কোনো বিপদ থেকে বাঁচার জন্য; দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের পক্ষ নিয়ে ওই ব্যক্তি বা বিষয়কে বড় করে জাহির করার জন্য; তৃতীয়ত, মানুষকে নিজের বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে বিভ্রান্ত করার জন্য; চতুর্থত, কোনো রাজনীতিক মতলব হাসিল করার জন্য; পঞ্চমত, অর্থ উপার্জনের জন্য। আজহারি সহেব সম্ভবত দ্বিতীয় কারণে মিথ্যে বলেছেন। শুধু আজহারি সাহেব নয়, এরকম বানোয়াট কথা আরও অনেক মাহফিল-বক্তা নিয়মিত বলে আসছেন। যেহেতু বাংলাদেশে কোনো ইমাম বুখারি নেই, সেহেতু এসব গল্পে সবাই বিশ্বাস স্থাপন করছে, এবং সত্য জ্ঞান করে তারা এগুলোর পক্ষে উদ্ভট উদ্ভট যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। ইমাম বুখারি যদি এসব উদ্ভিট যুক্তির আশ্রয় নিতেন, তাহলে তাঁকে ৫ লক্ষ ৯২ হাজার হাদিস বাতিল করতে হতো না।

দুই— হাসান হাদিস। হাসান শব্দের বাংলা হলো ‘ভালো’। ইংরেজিতে ‘গুড’। অর্থাৎ এ হাদিসগুলো সহিহ হাদিসের মতো নির্ভরযোগ্য নয়, কিন্তু দলিল হিশেবে ব্যবহার করা যায়। এগুলো অনেকটা সহিহ হাদিসের মতোই, কিন্তু ইসনাদে সামান্য ফাঁক-ফোঁকর থাকার কারণে এগুলোকে আলাদা করা হয়েছে হাসান হাদিস হিশেবে।

তিন— দা’ইফ বা দুর্বল হাদিস। সাধারণত ইসনাদে বড় ফাঁক-ফোঁকর থাকলে, বা হাদিসটির চেইন অব ন্যারেশনে, কোনো বর্ণনাকারীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ থাকলে, হাদিসটিকে দুর্বল হাদিস ধরা হয়। ধর্মীয় দালিলিক কাজে, দুর্বল হাদিসের আশ্রয় নেয়া উচিত নয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমি প্রায়ই লক্ষ করেছি, বিভিন্ন মাওলানা, তাদের প্রতিপক্ষকে আঘাত করার জন্য দা’ইফ হাদিসের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও রাগ প্রকাশের হাতিয়ার হিশেবে হাদিসের ব্যবহার খুব জঘন্য কাজ বলে মনে করি। এ মওলানাদের ব্যাপারে, মুসলিমদের সাবধান হতে হবে।

চার— মাওদু বা বানোয়াট হাদিস। ইমান বুখারি এগুলোর ব্যাপারেই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ হাদিসগুলোর নানা উৎস আছে। তার মধ্যে ইহুদি ধর্মের তালমুদই প্রধান। মুসলিমদের কাছে হাদিসের গুরুত্ব যেরকম, ইহুদীদের কাছে তালমুদের গুরুত্বও তেমন। ইমাম বুখারি যে ৫ লক্ষ ৯২ হাজার হাদিসকে সহিহ নয় বলে বাতিল করেছিলেন, তার অধিকাংশই ছিলো তালমুদের নানা বাক্য ও ভাবের হুবহু নকল। শুধু উৎস হিশেবে তালমুদের বদলে ইসলামের কোনো সাহাবীর নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি ইসলাম ধর্মের নবী ও তাঁর সাহাবীদের উপর এক ধরণের মিথ্যাচার। বুখারির একটি হাদিসে এ মিথ্যাচারের শাস্তি উল্লেখ করা আছে।

তালমুদ ছাড়াও বানোয়াট হাদিস আরও অজস্র উৎস থেকে এসেছে। এর মধ্যে জোরোয়াস্ট্রিয়ান ও খ্রিস্টান ধর্মে উল্লেখযোগ্য। জোরোয়াস্ট্রিয়ান এবং খ্রিস্টান ধর্মের বহু প্রথা ও আচার, বানোয়াট হাদিসগুলোতে সুন্নত বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব হাদিসে যে-বার্তা দেয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নির্বিষ উপকারি বার্তা। ফলে যাদের খুব জানাশোনা নেই, তারা সহজেই এসব মিষ্টি কথাকে নবীর বাণী হিশেবে ধরে নিয়েছেন। কারণ মিষ্টি কথাকে তারা কখনোই সন্দেহ করে না। কিন্তু আমি একটু তিতা কথা বললে, তারা নানা জায়গা থেকে কপি-পেস্ট ছবি ও যুক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা ভাবে, এ মিষ্টি কথাটি নিশ্চয়ই রাসূল বলেছেন! পৃথিবীতে যতো ভালো কথা আছে, তার সবগুলোর মালিক আমরা। কিন্তু মিথ্যে কথা যার মুখ দিয়েই বের হোক না কেন, সেটি মিথ্যে কথা। একটি মিথ্যে কথার সাথে বিশ কোটি লোক একমত পোষণ করলেও কথাটি মিথ্যেই থাকে। এটি সত্য হয়ে যায় না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ বানোয়াট হাদিসগুলো কারা ছড়িয়েছে? এর উত্তরে বলবো— বানোয়াট হাদিসের উদ্ভব মূলত স্বার্থ থেকে। নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, তাদের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এগুলোর প্রচলন ঘটিয়েছে। অনেক ধর্মীয় পীর-দরবেশ, তাদের আর্থিক ও সামাজিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে, মুরিদদের মধ্যে কিছু ভুয়া হাদিস প্রচার করেছে। কিছু ধর্মীয় রাজনীতিক নেতা, তাদের নিজ নিজ রাজনীতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যও সময়ে সময়ে মনগড়া কথা বলেছে, এবং কথাগুলোকে রাসূল ও তাঁর সাহাবিদের নামে চালিয়ে দিয়েছে। উত্তেজিত জনতা কখনোই এগুলোর সত্যতা যাচাই করতে চায় নি। কিছু জাল হাদিস এসেছে পারিবারিক ও সামাজিক কলহ থেকে। ধরা যাক আজ থেকে ৫০০ বছর আগে কোনো স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া করছেন। স্ত্রী হয়তো তর্কাতর্কিতে এমন কোনো যুক্তি দিয়েছেন, যার উত্তরে স্বামীর কিছু বলার ছিলো না। দেখা গেলো স্বামীটি, তাঁর ধর্মপ্রাণ স্ত্রীকে বশ করার জন্য একটি কথা রাসূলের নামে চালিয়ে দিলো। যেমন— যে-নারী স্বামীর সাথে তর্ক করবে, সে জাহান্নামে যাবে, এরকম একটি কথা যদি কেউ বানিয়ে বুনিয়ে, রাসূল বা তাঁর কোনো সাহাবির নামে চালিয়ে দেয়, তাহলে অনেক ধর্মভীরু নারীই এটিতে বিশ্বাস স্থাপন করবে। অনেক জঙ্গী, তাদের জঙ্গি-কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্যও মনগড়া হাদিস উদ্ভাবন করে থাকে। ধর্মীয় বক্তারাও এমন করেন। প্রায়ই তারা নানা মতবাদ নিয়ে কলহে লিপ্ত হন, এবং আশ্রয় নেন নকল হাদিসের।

পাঁচ— মুতাওয়াতির বা অতিশুদ্ধ হাদিস। কোনো হাদিস যদি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সাহাবি দ্বারা, বারবার অবিকল বর্ণিত হয়ে থাকে, তাহলে এটিকে মুতাওয়াতির হাদিস হিশেবে ধরে নেয়া হয়। হাদিসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ শ্রেণীর। এগুলোর মর্যাদা অনেকটা কোরআনের আয়াতের কাছাকাছি। এ হাদিসগুলো রাসূলের বাণী কি না, এ ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এরকম হাদিসের সংখ্যা মাত্র দশ থেকে পনেরোটি! যেহেতু মারামারি করার সময় মুতাওয়াতির হাদিস কোনো কাজে লাগে না, সেহেতু মাওলানারা এ হাদিসগুলোর কথা তাদের ভক্তদের খুব একটা বলেন না। আবার অনেক মাওলানা জানেনই না মুতাওয়াতির হাদিস কী।

এজন্য কোরআনের বাহিরে কোনো কথা, মুসলিমদের খুব সাবধানে আমলে নিতে হবে। কোনো উদ্ভট কথা কেউ বললে, সেটির সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করতে হবে, এবং যাচাই করতে হবে কথাটি সত্য কি না। ইসলামে ঈমান আনার জন্য কী কী মৌলিক বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, তা কোরআনে স্পষ্ট বলা আছে। তার বাহিরে গিয়ে আগ বাড়িয়ে, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে আজান শুনেছেন, এ ধরণের কল্পকথায় বিশ্বাস স্থাপনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এরকম কথা কোনো বক্তা, যতো মধুর কন্ঠেই বলুক না কেন, বুঝতে হবে ওই বক্তা আপনাকে আহাম্মক বানাতে চাচ্ছেন। তিনি ধরে নিয়েছেন আপনি একটি আহাম্মক। আপনাকে যা বলা হবে তাই আপনি বিশ্বাস করবেন। এরকম বক্তাদের হাত ধরেই কিন্তু ওই ৫ লক্ষ ৯২ হাজার হাদিসের অনেকগুলোর জন্ম হয়েছিলো।

প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কি আমরা হাদিসের কথা শুনবো না? হ্যাঁ, শুনবেন, কিন্তু সতর্কতার সাথে। হাদিসের কথা বা নবীর সুন্নতের কথা আমলে নিতে হবে, এরকম ইঙ্গিত মুসলিমদের জন্য কোরআন শরীফে আছে। সূরা ইমরানের ৩২ নাম্বার আয়াতে এসেছে— কুল আতিওল লাহা ওয়ার-রাসুলা, অর্থাৎ আল্লাহ এবং রাসূলকে মান্য করো। মুসলিমরা রাসূলকে কেন মান্য করবে? এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে সূরা কালামের ৪ নাম্বার আয়াতে। ওখানে বলা হয়েছে— ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আজিম, অর্থাৎ আপনি (রাসূল) উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। রাসূলের চরিত্রের এরকম প্রশংসা, আমি সূরা আযহাবের ২১ নাম্বার আয়াতেও দেখেছি। ওই আয়াতে তাঁর জীবনকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য মুসলিমদের মাঝেমধ্যে হাদিসের আশ্রয় নিতে হয়, না হলে রাসূলের জীবন ও চরিত্র কেমন ছিলো; সমাজ, রাজনীতি, পরিবার, অর্থনীতি, ইত্যাদি বিষয়ে মুসলিমদের জন্য তাঁর নির্দেশনা কী ছিলো, তা জানা সম্ভব হতো না। এ সুযোগটিই নিয়েছে শয়তান। শয়তান কয়েকটি মাইক ভাঁড়া করে, কিছু গোঁড়া মাওলানার কাঁধে সওয়ার হয়ে, নব্বইটি ইসলামি কথার সাথে দশটি শয়তানি কথা জুড়ে দিচ্ছে! আর আহাম্মকেরা তা বিশ্বাস করছে!

কিন্তু ধর্ম পালন করতে আহাম্মকি ও গোয়ার্তুমির কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি গোয়ার্তুমি না করেও এটি সুন্দরভাবে পালন করতে পারেন। নামাজ পড়ার জন্য, বা ইসলামকে মহিমান্বিত করার জন্য, ফেসবুক-ইউটিউবে সৈন্য সাজারও দরকার নেই। ইসলামকে মহিমান্বিত করার দায়িত্ব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন, যদি আল্লাহর উপর আপনার আস্থা থাকে। অবশ্য আস্থা না থাকলে ভিন্ন কথা, তখন চাইলে মিথ্যে কথা ও উদ্ভট যুক্তির আশ্রয় নেয়া যেতে পারে।

কেউ কিছু বললেই সেটিকে সত্য জ্ঞান করার অভ্যাসও ত্যাগ করতে হবে। কে বলেছেন, এদিকে নজর না দিয়ে, নজর দিতে হবে কী বলা হয়েছে তার উপর। এরিস্টোটল তো সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মনিষী, কিন্তু তাই বলে কি আমি তাঁর সব কথা আমলে নিয়েছি? নিই নি। এরিস্টোটলের ধারণা ছিলো— নারীদের মুখে দাঁতের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে কম। এরিস্টোটল এটিকে সত্য ভাবতেন। কিন্তু এ সত্য আসলেই সত্য কি না, তা এরিস্টোটল যাচাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ তাঁর স্ত্রী ছিলো, এবং মিসেস এরিস্টোটলকে হা করিয়ে সহজেই তিনি এর সত্যতা নিরূপণ করতে পারতেন। তাঁর আরও অনেক কথা আছে, যা এখন হাস্যকর কৌতুকে পরিণত হয়েছে। যেমন— (১) গর্ভধারণ করা উচিত শীতকালে, যখন বাতাস উত্তর দিক থেকে বয়; (২) কম বয়সে বিয়ে করলে মেয়ে বাচ্চা হবে; (৩) পুরুষদের চেয়ে নারীদের রক্ত অধিক কালো।

এজন্য যেকোনো উত্তেজনাকর সুখের কথা, কথাটি যতো বড় মাওলানাই বলুক না কেন, তার সত্যতা আপনাদের নিজ দায়িত্বে যাচাই করতে হবে। কেউ যদি কাতার থেকে কায়রো যাওয়ার পথে এভারেস্ট দেখে থাকে, তাকে বলুন, আমিও দোহা-টু-কায়রো ফ্লাইটের জানালা দিয়ে এভারেস্ট দেখতে চাই! যদি তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, না, স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে, কাতার থেকে কায়রো যাওয়ার পথে নয়, ঢাকা থেকে কাতার যাওয়ার পথে দেখেছি, তাহলেও প্রশ্ন করুন, এবং যাচাই করুন কথাটি সত্য কি না। পরিচিত কাউকে জিগ্যেস করুন, তিনিও এমনটি দেখেছেন কি না। যেমন আমি বহুবার কাতার এয়ারওয়েজে লন্ডন গিয়েছি। যাওয়ার পথে দোহায় থেমেছি। ঢাকা-টু-দোহা ফ্লাইটের জানালা দিয়ে আমি কোনোদিন এভারেস্ট দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কেউ যদি দেখে থাকেন আমাকে জানাতে পারেন, তাহলে পরবর্তী কোনো যাত্রায় আরও ভালো করে দেখে নেবো। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও বহুবার গিয়েছি। মহাকাব্য গিলগামেশের কিউনিফর্ম ট্যাবলেট নিয়ে অনেকবার নাড়াচাড়া করেছি। কিন্তু ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গেইটে বড় করে ‘মুহাম্মদ’ লেখা আছে, এরকমটি কখনো দেখি নি। দেখলে আজহারি সাহেবের আগে, আমিই আপনাদের জানাতাম।

এজন্যই আমি আপনাদের পড়াশোনা করতে বলি। কারও মাথায় বাড়ি মারার কথা আপনাদের কোনোদিন বলি নি। কিন্তু যারা অন্যের মাথায় বাড়ি মারার কথা বলে, তাদের কথা কিন্তু আপনারা খুব মন দিয়ে শোনেন।

খুব বেশি পড়াশোনা যে করতে হবে, ব্যাপারটি এরকমও নয়। সাধারণ ইসলামি কাজের জন্য অর্থসহ কোরআন এবং সহিহ হাদিসগুলো পড়াই যথেষ্ট। কিছু ক্ষেত্রে, প্রয়োজন অনুযায়ী তাফসিরের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। আর যে-ধর্মটি আপনি পালন করবেন, সে-ধর্মটির নানা দিক নিয়ে আলোচনার অধিকার আপনার অবশ্যই আছে।

ইসলাম ধর্মের মালিকানা, আল্লাহ কোনো মাওলানা গোষ্ঠিকে দিয়ে দিয়েছেন, এরকমটি শোনা যায় না। কেউ কেউ অবশ্য নানা দোহাই এরকম কথা দাবি করে থাকেন, তবে তাদের কথা আসলে শয়তানের কথা। তারা তর্কাতর্কি ও স্বার্থ উদ্ধারের খাতিরে এসব বলে থাকেন।

এই পড়তে হবে সেই পড়তে হবে, ভালোভাবে পড়তে হবে, আরও ভালো করে পড়তে হবে, বুঝে পড়তে হবে, আরও বুঝে পড়তে হবে, আপনি বুঝতে ভুল করেছেন, আপনি আরও ভালো করে বুঝুন, অমুক কিতাব পড়ুন, তমুক কিতাব পড়ুন, এসব যারা বলেন, তাদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

তারা স্বীয় স্বার্থে, নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আপনাকে কোদাল হিশেবে ব্যবহার করতে চায়। আমি চাই না আপনি কারও কোদাল হোন। এতে শয়তান রাগ করলে আমার কী করার থাকতে পারে?

—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *