ধর্ষণ এবং ‘বলাৎকার’কে একই আইনে বিবেচনা করা হোক

আফরিন নুসরাত
আফরিন নুসরাত

ফাহিম সাহেব তার দুই পুত্র সন্তান নিয়ে বেশ নিশ্চিত থাকছেন ইদানীং। বছর ঘুরে এলো বিপত্নিক হয়েছেন তিনি। যা দিনকাল পড়েছে, একটি কন্যা সন্তানের আকুলতা থাকলেও ইদানীং যে তা বাবা-মায়ের চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ভাবনা তাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। তারপর আবার মা-হারা সন্তান; ছেলে দেখে ভারমুক্ত বোধ করছেন কিছুটা।

শহর থেকে শুরু করে মফস্বল কোথাও নিস্তার নেই মেয়েদের, ইভটিজিং থেকে শুরু করে ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ সময় তো উল্টো মেয়ের ঘাড়েই দোষ পড়ছে, তাদের পোশাককে দায়ী করা হচ্ছে।
এসব ভেবে কূলকিনারা না পেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন অবসরে।

কিন্তু হঠাৎ ছোট ছেলেটার দিকে চোখ পড়তে সেই প্রশান্তি উবে গেলো; বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। বড় ছেলেটা তখনও টিউশন থেকে ফেরেনি, ছোট ছেলে বাসাতেই গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ছিল। ছেলের ছাইরঙা পায়জামায় রক্তবর্ণ দেখে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাবা তুমি কি পড়ে গিয়েছিলে, তোমার পায়জামায় রক্তের দাগ কোথা থেকে এলো?’

কথাটা শুনে ছেলেটা আতঁকে উঠলো! ভয়ে পেয়ে, ‘কই কিছু না তো’ বলে দ্রুত চোখের আড়ালে চলে গেলো। ছেলের এই আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলো। হঠাৎ পত্রিকায় মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকারের সংবাদগুলো তার চোখে ভেসে উঠলো। এমন কিছু নয় তো?

চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো ফাহিম সাহেবের। এই ভয়ংকর ঘটনা তার ঘরেও ঘটে যেতে পারে সেটা তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তবু ছেলেকে কাছে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো ছোট শিশুটি।

গৃহশিক্ষক দ্বারাই নিপীড়নের শিকার হবে তার ৮ বছরের ছেলে সন্তান, সেটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। ওদিকে আঁচ করতে পেরে গৃহশিক্ষকও আর আসছেন না পড়াতে কিন্তু এই পাশবিকতার বিচার তিনি কীভাবে করবেন? কীভাবে ছেলেকে সামলাবেন, কোন আইনে বিচার চাবেন?

বলাৎকারের কোনও বিচার কি আছে প্রচলিত আইনে? এগুলো ভাবছেন আর ছেলে সন্তান দেখে নিরাপদে রয়েছেন সেই ভাবনার ভ্রান্তপথে কাঁটা বিছিয়ে দিলেন মনে মনে।

ফাহিম সাহেবের ছেলের ঘটনা আমাদের সমাজের সচিত্র প্রতিবেদন। আশপাশে এমন অসংখ্য ছেলে শিশু পাওয়া যাবে যাদের সাথে এমন যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে।

Positive parenting counselling করেন এমন একজন ডাক্তার কিছু দিন আগে বাচ্চাদের ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’ শিখানোর একটি পারেন্টিং কোর্সে বলেছিলেন যে তাদের কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার যে শিশুগুলো আসে তাদের মধ্যে ছেলেমেয়ের অনুপাত ১:১।

তার মানে ১০ জন শিশু এলে তারমধ্যে ৫ জন ছেলে শিশু এবং ৫ জন মেয়ে শিশু। সুতরাং এখন ছেলেরা যৌন নির্যাতনের শিকার হবে না, যৌন নির্যাতন শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে ঘটে এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বরং একটি গবেষণায় জানা গেছে, ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের হার মেয়ে শিশুদের থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক তবে বিষয়টি চাপা থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

খুব কম সংখ্যক পুরুষ তাদের পরিণত বয়সেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, আত্মসম্মানবোধ বা অনেকে সচেতনভাবে বিষয়টি চেপে বা এড়িয়ে যান।

এ ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার সবচেয়ে বেশি হয় এতিম শিশুরা। কারণ, অভিভাবকহীনতা। একশ্রেণির কিছু হায়নার দল যারা ধর্মীয় লেবাস গায়ে জড়িয়ে এসব কমলমতি শিশুদের দিনের পর দিন ধর্ষণ করে যাচ্ছে।

অনেক সময় জানাজানি হলে সামান্য কিছু শাস্তি হয়, কিন্তু আবার তারা সমাজে একই কাজ করে যাচ্ছে বিচারহীনতার কারণে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক প্রকার জিম্মি করে দিনের পর দিন তারা একই কাজ করে যাচ্ছে এবং আমাদের সচেতন সমাজ এই মনে করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন যে তার সন্তান তো নিরাপদে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ফাহিম সাহেবের ঘটনা খুবই প্রাসঙ্গিক। সমাজে যখন কোনও অসঙ্গতি থাকে তখন সেটাকে যদি সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ না করা যায় তাহলে তা আস্তে আস্তে সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে।

ধর্ষণ ক্যান্সারের মতো। ধর্ষণের বিচার নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার ঠিক ততটাই সচেতনভাবেই অবহেলা করি বলাৎকারকে। এই বলাৎকারের কথা সামনে এলেই একটি বিশেষ গোষ্ঠী আছে যাদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়।

তখন প্রশ্ন এসেই থাকে কেন তাদের বলাৎকারের বিচার চাওয়া নিয়ে এত অনীহা বা বিচার চাইলে তারা ভিন্ন কোনও ইস্যু সামনে এনে অভিযোগগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

এছাড়াও আইন প্রয়োগকারীদের আইন সম্বন্ধে অস্পষ্ট ধারণা থাকার কারণে ধর্ষণের শিকার বেশিরভাগ ছেলে শিশুই ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে’র কঠোরতম শাস্তির বিধান আর দ্রুত বিচার ব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষক তাসলিমা ইয়াসমীনের বলাৎকার নিয়ে প্রচলিত আইনে কী বলে সেই বক্তব্য পাঠকের বিস্তারিত জানার সুবিধার্থে তুলে ধরলাম।

‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে শুধু একজন ‘নারী’, একজন পুরুষের মাধ্যমে (দণ্ডবিধি ধারা-৩৭৫)। শুধু তাই নয়, দণ্ডবিধির সংজ্ঞাটি বলছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে যৌন সঙ্গম বিবেচনা করার জন্য ‘পেনেট্রেশন’-ই (প্রবিষ্ট করা) যথেষ্ট।

অথচ সংজ্ঞাটিতে কোথাও ‘পেনেট্রেশন’-এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। স্বভাবতই তাই বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ধর্ষণকে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক যৌন সঙ্গমের প্রচলিত ধারণাকেই বুঝে থাকেন।

ব্রিটিশ আমলে প্রণীত দণ্ডবিধির ধর্ষণের এই সংজ্ঞাটি তাই ছেলে শিশুর ধর্ষণকে ধর্ষণ না বলার পেছনে একটি অন্যতম কারণ।

তবে দণ্ডবিধি থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা কঠোরভাবে দমন করতে ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’। এই আইনটিতে ‘শিশু’র যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনও লিঙ্গ বিশেষে নয় বরং ১৬ বছরের কম বয়সী যে কোনও শিশুই এই আইনে বিচার পাওয়ার কথা।

কিন্তু ‘পেনেট্রেশন’ বলতে আসলে কী কী ধরনের যৌন সঙ্গমকে বুঝাবে, তা কোনও আইনেই নির্দিষ্ট করা নেই।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে মামলার এফআইআর রুজু হয় বরং দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭-এ। ব্রিটিশ আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ৩৭৭ ধারা, আসলে সমকামিতাসহ ‘প্রাকৃতিক’ নিয়মের বিরুদ্ধে করা কোন যৌন সঙ্গমকে দণ্ডনীয় করছে।

সমলিঙ্গের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার ছেলে শিশুকেও তাই ৩৭৭-এর অধীনেই বিচার চাইতে হয়।

এই ধারায় (৩৭৭-এ) অপরাধী বা অপরাধের শিকার ব্যক্তির বয়স, সম্মতি বা অসম্মতির প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক। আবার, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর ৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও, ৩৭৭-এ সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তাতে কোনও সর্বনিম্ন শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করা নেই।’

সম্প্রতি ভাস্কর্য ইস্যুতে ড. জাফরুল্লাহ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে বলাৎকার নিয়ে যে ভর্ৎসনা করেছেন সেটি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বলাৎকারের এই বিষয়টি যখন ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক লেবাসে আবদ্ধ করার কূট চক্রান্ত হচ্ছিল তখন রাজনৈতিক মতবিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি এই বিষয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে এক হাত নিয়েছেন।

বাংলাদেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক দাবিতে একসাথে সুর মেলানোর বিষয়টা কিছুটা দিবাস্বপ্নের মতো। তবে একবিংশ শতাব্দীতে সকল যৌক্তিক দাবি এবং নাগরিকদের পালস যদি রাজনীতিবিদরা বুঝতে না পারে তাহলে রাজনীতি একটা সময় জনবিমুখ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শুধু বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা সেই প্রথা বাদ দিয়ে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার অনুশীলন থাকতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু দেশের স্বার্থে, সামাজিক ভারসাম্যতা বজায় রাখতে, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে সকলকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসার সময় হয়েছে।

ধর্ষণ এবং বলাৎকার নিয়ে প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসায় কর্মশালা করানো সময়ের দাবি। সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই, যত বেশি বেশি এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে তত বেশি বেশি মানুষ সচেতন হতে থাকবে।

ধর্ষক সে নারী/পুরুষ/শিশু যা কেউ যৌন নিপীড়ন বা নির্যাতন করুক না কেন একইভাবে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে এবং একই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের অপ্রতুলতা দূর করতে হবে সাথে যেসব শিশু এমন পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদের কাউন্সিলিং করার জন্য সঠিক নীতিমালা তৈরি করে সেগুলো নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করার পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।

বাবা-মা এবং পরিবারের সকল সদস্য বিষয়টিকে কীভাবে সামলাবে বা শিশুদের সাথে তাদের আচরণ কেমন হবে সেই বিষয়ও অভিভাবককে বুঝানোর জন্য দক্ষ কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে এবং যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তদারকি করাও জরুরি।

প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তুকে ‘খারাপ স্পর্শ’ এবং ‘ভালো স্পর্শ’ অন্তর্ভুক্তি করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করছি।
দেশের স্বার্থে কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে জেনে শুনে শিশু ধর্ষণের লাইসেন্স আমরা তুলে দিতে পারি না।

শুধু শব্দগত পার্থক্যের কারণে ধর্ষণ এবং বলাৎকারকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে হোক একটি শিশুর জীবনে যখন এরকম ভয়াবহ যৌন নির্যাতন অথবা নিপীড়নের ঘটনা ঘটে তখন সে এই ভয়ংকর ট্রমা থেকে বের হতে পারে না। তার শিশু মনে কালো রেখা অঙ্কিত হয়, যা সে আমৃত্যু বহন করে।

শিশুর মনোজগতে যে বিরূপ ছায়া প্রোথিত হয় সেটা তার মনস্তত্ত্বে যে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে সেটা থেকে শতকরা ৯৫ শতাংশ শিশু বের হয়ে আসতে পারে না। অনেক সময় চক্রাকারে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকে।

বিষয়টা অনেকটা র‌্যাগিংয়ের পর্যায়ে চলে যায়; বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কিছু মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর নিপীড়নের সচিত্র প্রতিবেদন থেকে যা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

ধর্ষণ এবং বলাৎকারকে একইভাবে বিবেচনা করে এর শাস্তিও সমান হওয়া উচিত। প্রচলিত আইনে শব্দগত বিভ্রাট দূর করে এই পাশবিক যৌন নির্যাতনের বিচারও একই নীতিমালায় হবে সেটা একজন অভিভাবক হিসেবে আমি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেই ধারাবাহিকতায় বলাৎকারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে আমাদের ছেলে সন্তানদের ভবিষৎ জীবনকে নিরাপদ করবেন- করজোড়ে সেই অনুরোধ করছি।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

nusrat224@gmail.com

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *