মূর্তি vs ভাস্কর্য এবং সমসাময়িক বাংলাদেশ

Mehebub Sahana

মেহেবুব সাহানা, যুক্তরাষ্ট্র থেকেঃ ম্যানচেস্টারের লং সাইটে করিম চাচার কাপড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ভাস্কর্য না মূর্তি নিয়ে গল্প হচ্ছিলো । করিম চাচা আমাদের মসজিদের মুরুব্বি সেই হিসাবে উনার দোকানে মাঝে সাঝে উঠা বসা ।

যেহেতু আমি ভারতীয় তাই ভাস্কর্য না মূর্তির জটিল গল্পে কান না দিয়ে চুপ চাপ পাশে দাঁড়িয়ে আছি । তর্ক শুনে বুঝলাম কাপড় ব্যবসায়ী করিম চাচা যে কোনো রকমের মূর্তি স্থাপনের চরম বিরোধী।

আমি সাইডে বসে চা এ চুমুক দিতে দিতে করিম চাচার দোকানের মেক্সিকান ম্যানিকুইন (display doll) গুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম ভাস্কর্য আর মূর্তির মধ্যে কোনো তফাৎ আছে কি নেই সেই প্রশ্নের থেকেও বড় প্রশ্ন একটি জাতিকে এমন একটা বিদঘুটে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে কেন?

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ আর ভারতের জিডিপির তুলনা নিয়ে যখন চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল তখন মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল উপমহাদেশে বাংলাদেশ বিশাল একটা সম্ভবনাময় দেশ ।

আমার এখনো বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশিদের সাথে আমার ইন্টারঅ্যাকশন হয়েছে জার্মানি, ইন্ডিয়া, মিডল ইস্ট, তুরস্ক আর ইংল্যান্ডের মধ্যে ।

আমার মনে হয় কাজের সূত্রে মাইগ্রেট করা পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই কম বেশি বাংলাদেশী পাওয়া যাবে । বর্তমানে আমি ইংল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতেই কম বেশি বাংলাদেশী স্টুডেন্ট/স্কলার/ফ্যাকাল্টি দেখতে পাই। আর বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের থেকে এই বিরাট সংখ্যার বিদেশী রেভিনিউ যে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু অবাক হয় এই বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী ওয়েস্ট এ থাকার পরও তাদের দেশের ভাবমূর্তির উপর ইন্টেলেকচুয়ালি প্রভাব ফেলতে অক্ষম ।

বর্তমান ভারতবর্ষের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের পিছনে ভারতের প্রবাসীদের বিশাল একটা অবদান আছে । তারা ইন্টেলেকচুয়াল সাপোর্ট, স্ট্রাটেজি মেকিং পলিসিতে বিশাল ভাবে কাজ করে চলেছে ।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রবাসীরা রবীন্দ্রনাথের “ওরা কাজ করে কবিতার মতো” কেবল কাজই করে চলেছে ।

সম্প্রতি ভাস্কর্য না মূর্তি ইস্যুতে কান পেতে দেখলাম প্রবাসী বাংলাদেশীদের অল্প কিছু ছাড়া সেই বিষয়ে তেমন কোনো ইন্টেলেকচুয়াল আর্গুমেন্ট অথবা পার্টিসিপেন্ট বিষয়ে মধ্যস্থতা করার পথে হেঁটেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে বাইরের দেশের যে কেউ নজর দিলে যেটা দেখতে পাই সেটা হলো, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কেবল মাত্র আলেম উলামারা বিদ্রোহ করেছে ।

আর সেই লক্ষ লক্ষ জনসমাবেশের মধ্যে আলেম ওলামারা যেভাবে আমেরিকার হোয়াইট হাউসে ইসলাম প্রতিষ্ঠার হুঙ্কার দেন , সেই হুংকার শুনে সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও মনে মনে ভাবেন, না বাংলাদেশে ভোট ঠোট করার কোনো দরকার নেই, যতদিন বাঁচবেন হাসিনা সরকারই থেকে যাক ।

আলেম উলামারা যে ভাবে জলসার মঞ্চ থেকেই সরকার পতনের হুমকি দেই তাতে মনে হয় দেশের একমাত্র রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ কেবল মাত্র তারাই ।

তাই গণতন্ত্র পছন্দকারী ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি ভেবেই নিয়েছে বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের পতন মানে এই দেশ কে আর কেও বাঁচাতে পারবেনা।

আমাদের ভারতবর্ষে ফ্যাসিস্ট সরকার যতই অত্যাচার করুক না কেন বিরোধী পক্ষ এক ইঞ্চি ও জমি ছেড়ে দেয় না। আমরা ফ্যাসিবাদের সাথে চোখে চোখ রেখে লড়াই করি ।

যার উদাহরণ, CAA, NRC movement, বর্তমান কৃষি আন্দোলন । কিন্তু বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির দিকে তাকিয়ে অবাক হয় । বিরোধীরা আলেম ওলামাদের সামনে এগিয়ে দিয়ে পিছন থেকে গুটি খেলে ।

তারা সব কিছুকে ক্রিকেটের মাঠের আবেগের মতো মনে করে । এত বড় সম্ভাবনাময় একটি দেশের একুশ শতকের রাষ্টভাবনায় ন্যাশনাল ডিবেটে যখন (মূর্তি vs ভাস্কর্য) উঠে আসে, আর বাইরের দেশের মানুষ যখন সেই ডিবেট সার্চ করতে গিয়ে দেখে সরকার এর সাথে আলেম ওলামাদের যুদ্ধ মাত্র।

আর সেই ডিবেট এর রেফারেন্স খুঁজতে গিয়ে কেবল মিলাদ মাহফিলের ওয়াজের উপর নির্ভর করতে হয়, তখন বোঝা যাই সেই দেশের সাধারণ মানুষ আমাদের মতো বুক চিতিয়ে CAA, NRC movement, বা কৃষি আন্দোলন এর পথে হাঁটেন না ।

বাড়িতে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে এলইডি টিভি অথবা ইউটুবের স্ক্রিন এ আলেম ভার্সেস রাষ্ট্র ব্যবস্থার ডিবেটে চোখ রাখতেই ভালোবাসেন ।

— Mehebub Sahana
ইউনিভার্সিটি ওব ম্যানচেস্টার
সাবেক শিক্ষার্থী
জহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি