প্রকাশ্যে ধুমপান অপরাধ নয়, এর প্রতিবাদে ধুমপান করাটাও সমর্থনযোগ্য নয়

ফরিদা আক্তার, নারী নেত্রী ও নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ
ফরিদা আক্তার,
নারী নেত্রী ও নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ

কিছুদিন ধরে ফেসবুকে একটি বিষয় নিয়ে খুব লেখালেখি চলছে, সাথে কিছু প্রতিবাদ। বিষয়টি হচ্ছে একজন নারী ধূমপায়ীকে প্রকাশ্যে ধূমপানরত অবস্থায় কিছু লোক এসে তাকে হেনস্থা করে এবং সেটা ভিডিও করে ভাইরাল করা হয়।

আরো পড়ুনঃ তরুণীকে ধূমপানে বাধা দেয়া নিয়ে যা জানালেন বারেক

কাজটি আরও অন্যান্য নারী নির্যাতনের ঘটনার মতোই নিন্দনীয় ঘটনা। আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। যারা মনে করছেন সেই ভদ্রলোক তামাক বা ধূমপান ক্ষতিকর বলে কাজটি করে সচেতনতার দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা ভুল করছেন।

আরো পড়ুনঃ জানা গেছে সেই ব্যাক্তির পরিচয়ঃ নাগরিকদের নিন্দা

তরুণীকে ধূমপানে বাধাদানকারী বারেক বললেন…

তিনি আইন না জেনেই কাজটি করেছেন। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫, সংশোধিত ২০১৩ আইনে কোথাও প্রকাশ্যে ধূমপান নিষেধ করা হয় নি। পাবলিক প্লেসে বলতে মূলত আচ্ছাদিত জনসমাগম স্থান, শিশু পার্ক ইত্যাদি সংজ্ঞা দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

এই নারী যেখানে ধূমপান করছিলেন সেটা এই সংজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। ফলে ধূমপান বা তামাক সেবন ক্ষতিকর হলেও (তিনি নিজ দায়িত্বেই নিজের ক্ষতি করছিলেন, তাঁর পাশে যিনি ছিলেন তারও পরোক্ষভাবে ক্ষতি হওয়ার কথা) তিনি আইন ভংগ করেন নি।

কাজেই কেউ এসে তাঁকে এভাবে ধূমপান বন্ধ করতে বলতে পারেন না। কাজটি একেবারে ঠিক হয় নি। ভিডিও করাটা হয়েছে রীতিমতো একটি অপরাধ।

আরো পড়ুনঃ পাবলিক প্লেসে সিগারেট খাওয়ার জন্য ধর্ষণ হয়?

একই সাথে বলতে চাই, এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যারা প্রতিকীভাবে সিগারেট হাতে নিয়ে এবং সিগারেট খাওয়ার পক্ষে নারীর সম-অধিকারের দাবি করছেন তাঁরাও ঠিক করছেন না।

আরো পড়ুনঃ হেনস্থার প্রতিবাদ জানাতে একই স্থানে তরুণ-তরুণীদের প্রকাশ্যে ধূমপান

রাজশাহীতে হেনস্থার প্রতিবাদ জানাতে এবার তরুণীদের প্রকাশ্যে ধূমপান
রাজশাহীতে হেনস্থার প্রতিবাদ জানাতে এবার তরুণীদের প্রকাশ্যে ধূমপান

নারীবাদের কাজ নয়, পুরুষের খারাপ স্বভাবকে বৈধতা দেয়া। সিগারেট বা বিড়ি এমন কি পানের সাথে জর্দা-সাদাপাতা খাওয়া, কিংবা নেশার বশে গুল ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর এবং আইনদ্বারা নির্দিষ্ট স্থানে সেবন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এখনো প্রায় সব দেশেই ধূমপান পুরুষদের মধ্যেই বেশি, তবে ইওরোপ আমেরিকায় নারীদের মধ্যে ধূমপান অনেক বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে ২৮.৭% প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ এবং ০.২% প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ধূমপান করেন।

যদিও নারীদের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামীণ এবং গরিব নারীদের মধ্যে জর্দা-সাদাপাতা ও গুলের ব্যবহার পুরুষের তুলনায় বেশি; ২৪.৮% নারী এবং ১৬.২% পুরুষ এই ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন।

তামাক কোম্পানিগুলো চায় মধ্যবিত্ত নারীরা সিগারট সেবনে এগিয়ে আসুক। এটা তাদের জন্যে একটা বড় বাজার, এটা তারা ধরতে চায়। সে কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংস্কৃতিক তাদের কর্মকান্ড বেশি করা হচ্ছে।

তামাক সেবনে জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয় তার অনেক গবেষণা আছে। ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারও অত্যন্ত বেশি। এসব নতুন কথা নয়। পুরুষ ধূমপায়িরা সিগারেট খেলে কেউ তাকে এভাবে হেনস্থা করে না ঠিকই, কিন্তু কোন ধূমপায়ি নিজেকে তামাক সেবী হিশেবে পরিচয় দিতে কুন্ঠা বোধ করবে।

তাদের মধ্যে সে অপরাধবোধ জেগে উঠছে। সবার মধ্যে না হলেও এই প্রবণতা বাড়ছে।
নারীবাদ সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন, অসমতা দূর করার জন্যে এক দীর্ঘ লড়াই। আমরা যেখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাই, সেখানে নিজের হাতে সিগারেট তুলে নিয়ে কী অর্জন করতেপারবো?

সিগারেট কোম্পানির কাজ সহজ করে দেয়া নিশ্চয়ই আমাদের কাজ নয়।

ফরিদা আক্তার,
নারী নেত্রী ও নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ