দিহানের ঘটনা সম্পর্ক যা বলছেন তার মা ও ভাই

দিহান

রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের পড়া শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত তানভীর ইফতেখার দিহান ঘটনার পরই মেঝো ভাই নিলয়ের সঙ্গে তিনবার ফোনে কথা বলেছিল।

সেটাই দিহানের সঙ্গে তার পরিবারের শেষ কথা। এরপর থানা, আদালত কোথাও যাননি তার পরিবারের সদস্যরা। দিহানের পক্ষে ছিল না কোনও আইনজীবীও।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এ ঘটনায় তারা সবাই লজ্জিত। বিচারে যদি প্রমাণ হয় দিহান অপরাধী, যা শাস্তি হবে তারা মেনে নেবেন।

শনিবার (৯ জানুয়ারি) দুপুরে এসব কথা বলেন ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ফারদিন দিহানের পরিবার।

কলাবাগানের লেক সার্কাস এলাকার ৬ তলা ওই বাড়িটির দিকে অনেকেরই কৌতূহলী চোখ।

বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন আবদুল রউফ সরকার। ২০০৮ সালে জেলা রেজিস্টার থেকে অবসর নিয়ে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে এই বাসা কেনেন। গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে হলেও তিন ছেলে নিয়ে এখানেই বসবাস করেন তিনি।

বড় ছেলে আরিফ ইফতেখার সুপ্ত রাজশাহীতে ব্যবসা করেন। পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন তিনি। মেঝো ছেলে ঢাকাতেই একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করেন। আর ছোট ছেলে এই দিহান। ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল শেষ করে জিইডি’র প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে।

করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকে রাজশাহীতেই থাকেন আব্দুর রউফ। চার বেডরুমের এই বাসাতে দুই ছেলেকে নিয়ে নিয়মিত থাকেন মা সানজিদা। দিহানকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন ছিল তাদের। করোনা না হলে গত বছরই দেশের বাইরে চলে যেতো দুই ভাই। পরিবারের পক্ষ থেকেও চলছিল এমন প্রস্তুতি।

ধর্ষণে অভিযুক্ত দিহানের পরিবার বলছে, আইন আছে, মেডিকেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আছে, যদি দিহান দোষ করে থাকে তার বিচার হোক। সে যদি অপরাধী হয় তার ফাঁসি হোক, সেটা আমরাও চাই।

আমরা ধরেই নিয়েছি সে অপরাধী, তাই আসামিপক্ষ থেকে কোনও আইনজীবীও রাখিনি। আমরা আসলে লজ্জিত। লজ্জিত কারণ আমরা এ ঘটনার কিছুই জানি না।

দিহানের ভাই নিলয় সরকার বলেন, ও যে মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করতো গত দুদিনে আমরা তার বন্ধু-বান্ধবীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। এর আগে শুধু জানতাম, ও প্রেম করে। তবে কার সঙ্গে করে সে বিষয়টা জানতাম না।

ঘটনার দিনের বর্ণনায় পরিবার যা বলছে

দিহানের মেঝো ভাই নিলয় সরকার বলেন, সকালে উঠে অফিসে চলে গিয়েছি। বগুড়াতে আমার নানা অসুস্থ, মা সেদিন সকালে নানাকে দেখতে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। আমার এক চাচা আবার ওইদিনই মারা যান। রাজশাহীতে জানাজা হয়েছে।

আমার বাবা সেখানে ছিলেন। বাসা সেদিন একদম ফাঁকা ছিল। হঠাৎ দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে দিহান আমাকে ফোন দিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে কথা বলে। জীবনে ওকে আমি কখনও কান্না করতে দেখিনি।

ফোন দিয়ে বলে, ‘ভাইয়া বাসায় বান্ধবীকে নিয়ে এসেছিলাম। অজ্ঞান হয়ে গেছে। হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি আসো, তুমি ছাড়া আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’

দিহানের ভাই বলেন, আমি ভয় পেয়ে যাই। তখনই আমার কর্মস্থল থেকে বের হয়ে এসেছি। দিহান বারবার ফোন দিচ্ছে ‘ভাইয়া তুমি দ্রুত আসো।’ পরে দুপুর ১টা ৫০-এর দিকে আবার ফোন করে। তখন বলে, ‘ভাইয়া ও তো মারা গেছে’।

তখন আমি বলি, ‘কে মারা গেল ঠিকঠাক মতো বলো’। দিহান বলে, ‘তুমি হাসপাতালে চলে আসো দ্রুত।’

নিলয় বলেন, আমি আইন অনুযায়ী বিচার চাই। আমরা যতটুকু মনে করি, এটা ধর্ষণ না। যদি আমার ভাই ধর্ষণ করতো, সে কখনও আমাকে ডাকতো না।

দিহানের মা সানজিদা সরকার বলেন, বিচারে যদি প্রমাণ হয় দিহান আসামি, যা শাস্তি হবে আমরা মেনে নেবো। কিন্তু আপনারা আমাদের পরিবারকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আমার নিজের সম্পর্কেও অনেক পত্রপত্রিকা বাজে মন্তব্য করছে। এভাবে বলা ঠিক না। আমাদের সঙ্গে একটা মানুষ দেখা করতে আসেনি।

আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তারাও কথা বলছেন না। কেউ দেখাও করছে না। মিডিয়া আমাদের পুরো পরিবারকে দোষ দিচ্ছে। এখানে আমাদের পরিবার কিভাবে অপরাধ করলো?

ভিকটিমের পরিবার কী বলছে

ভিকটিমের মা বলেন, আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ধানমন্ডি মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’লেভেলে পড়াশোনা করতো। তবে কোচিং করে লালমাটিয়াতে।

আনুশকাহ পরিবার

সেদিন আমি সকালে অফিসে যাই। বেলা ১১টায় দিকে সে ফোন করে জানায়, কিছু নোট আনতে বাসার বাইরে যাবে। তারপর দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে আমার মেয়ের ফোন থেকে একটা কল আসে। দিহান পরিচয় দিয়ে এক ছেলে বলে, ‘আন্টি আপনার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। পরে হাসপাতালে গিয়ে দেখি চার ছেলে বসে আছে।’

নির্যাতিত কিশোরীর বাসার গার্ড সোলায়মান বলেন, ওইদিন আমার ডিউটি ছিল। ঠিক ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে মেয়েটা বের হয়। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বাহিরে। দেখি সে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছে।

কিশোরীর চাচাতো ভাই নাজমুল বলেন, আমি যতটুকু শুনেছি কোচিংয়ের কারো মাধ্যমে পরিচয় হয়েছে ছেলেটার সঙ্গে। পরে ফেসবুকে তাদের কথা হতো। তারপর সম্পর্ক।

তবে মেয়েটা ছোট তাকে ফুঁসলিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেছে ছেলেটা। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

ঘটনা সম্পর্কে যা বললেন দিহানের মা

রাজধানীর কলাবাগানে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত দিহানের মা ঘটনা সম্পর্কে একটি জাতীয় গণমাধ্যমকে ই-মেইল বার্তায় নিজের বক্তব্য পাঠিয়েছেন। বক্তব্যে তিনি একজন মা হিসেবে এ ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়ে ন্যায়বিচার চেয়েছেন। নীচে তার বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হল।

ই-মেইল বার্তায় দিহানের মা লিখেছেন, ‘গত ৭ জানুয়ারি আমার বাসায় আমার ছেলে দিহান ও ওর বান্ধবী অরনা আমিন এর ঘটনায় আমি হতবাক। একজন মা ও নারী হিসেবে এ ধরনের ঘটনা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর।

এরপর গত দুইদিন আমি কোনো সংবাদ মাধ্যমে কথা বলিনি। কারন আমি পুরো ঘটনাটিকে প্রথমে বোঝার চেষ্টা করেছি। দিহানের বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমার ছেলের ধর্ষক এবং হত্যার উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা মা হিসেবে জানার চেষ্টা করেছি।

কারণ একজন নারী হিসেবে কোনো কিশোরীর অসম্মান হোক বা ধর্ষিত হোক সেটা কখনো চাই না।

৭ জানুয়ারি সকাল ১০টা ৪৫ টায় আমি আমার অসুস্থ পিতাকে দেখতে যাওয়ার জন্য দিহানকে বাসায় একা রেখে বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। আমার অন্য ছেলে নিজের কর্মস্থলে ছিল।

যমুনা সেতু পার হওয়ার পর বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে প্রাথমিকভাবে জানতে পারি মডার্ন হাসপাতালে দিহানের বান্ধবী মারা গেছে, সে কারণে দিহানকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। দ্রুত ঢাকায় এসে দেখি পুলিশ আমার বাসায়। জানলাম মেয়েটি আমার বাসায় দিহানের সঙ্গে দেখা করতে এসে ধর্ষিত হয়েছে এবং মারা গেছে।

মা হিসেবে আরও আগে থেকেই একটু আন্দাজ করতে পেরেছি, আমার ছেলে কোনো একটি সম্পর্কে জড়িয়েছে। কিন্তু কোন মেয়ের সাথে তা জানা ছিল না।

তবে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মেয়েটির “Aurna Amin” নামের ফেসবুক আইডিতে দিহানের সাথে ঘনিষ্ঠ ছবি, দিহানকে নিয়ে কবিতা লিখা ইত্যাদি দেখে মনে হলো এই মেয়েটির সাথেই দিহান সম্পর্কে জড়িয়েছে।

আমি ধারণা করছি আমি বাসা থেকে বের হবার পর দিহান মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করলে মেয়েটি আমার বাসায় আসে। দিহানের সাথে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক ছিল বিধায় মেয়েটি আমার বাসায় এসেছিল।

আমি মনে করি ধর্ষণ বা হত্যার উদ্দেশ্যে দিহান মেয়েটিকে বাসায় ডাকেনি। একজন আরেকজনকে ভালোবাসে, সেই হিসেবে একান্তভাবে সময় কাটানোর জন্যই হয়ত ডেকেছিল।

উভয়ের বয়স কম, একজন নাবালিকা এবং আমার ছেলেরও বয়স ১৮ বছর ৭ মাস অর্থাৎ কিশোর। আবেগের বসে উভয়েই শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিল এবং অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে। পরবর্তীতে যা হয়েছে তা নিতান্তই দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে।

আমার ছেলে ধর্ষক বা হত্যাকারী হলে সে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতো কিন্তু সে তা করেনি। সে নিজে গাড়ি করে মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মেয়েটির মাকে ফোন করেছে, পুলিশের কাছে ঘটনা স্বীকার করেছে।

আমার ছেলে যদি মেয়েটির সাথে অন্যায় করে তাহলে একজন নারী হিসেবে আমিও আমার ছেলের যথাযথ বিচার হোক সেটা চাই।

কিন্তু মেয়েটির ইচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল কিনা এবং একমাত্র শারীরিক সম্পর্কের কারণেই রক্তক্ষরণ ও মৃত্যু হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ প্রশাসনের উপর আমি বিশ্বাস রাখতে চাই এবং বিচার বিভাগের উপর আস্থা রাখতে চাই।

বিচারের আগে আমার ছেলেকে ধর্ষক বা হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত না করার জন্য সমাজের সকলের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে আরো পড়ুনঃ

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *