থমাস সাংকারা: আদর্শের মৃত্যু নেই

১৯৮৩ সালে ক্যাপ্টেন থমাস সাংকারা বুরকিনা ফাসো এর প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। তখন উনার বয়স ৩৩ বছর

সাংকারা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তার সাধারণ জীবন, সমাজবাদী কার্যক্রম, অর্থনৈতিক উন্নতি, ক্ষমতাবান গোষ্ঠির সাথে সাহসী দ্বন্দ ও প্রতিরোধের জন্য, সাম্রাজ্যবাদী এবং নয়া উপনিবেশবাদীদের মোকাবিলার জন্য।

মার্কিন ফ্রান্স যৌথ ষড়যন্ত্রের ফলে মাত্র ৪ বছর পরেই সাংকারাকে প্রাণ হারাতে হয়।

ওই ৪ বছরে সাংকারা যা করেছিলেন –
-;তার নিজের বেতন কমিয়ে ৪৫০ ডলার নির্ধারণ করেন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য ১টা গাড়ি, ৪টা মোটরবাইক, ৩টা গিটার, ১টা ফ্রিজ এবং ১ টা নষ্ট ফ্রিজার সীমাবদ্ধ করেন।

সেনাবাহিনীর সর্ব্বোচ্চ পদ ক্যাপ্টেন নির্ধারণ করেন এবং আজীবন ওই পদেই আসীন ছিলেন।

সরকারের হাতে থাকা মার্সিডিজ বেঞ্জ এর গোটা বহর বিক্রি করে দেন এবং বুরকিনা ফাসোতে প্রচলিত সবচেয়ে সস্তা গাড়ি মন্ত্রিদের জন্য নির্ধারণ করে দেন।

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ লক্ষ শিশুকে মেনিনজাইটিস, ইয়েলো ফিভার এবং মিজলসের টীকা দেয়ার কাজ সম্পন্ন করেন।

দেশজুড়ে নিরক্ষরতা দুর করতে কাজে নেমে পড়েন। ১৯৮৩ তে সাক্ষরতা ছিল ১৩% সাংকারা সেটিকে ৭৩% নিয়ে যান মাত্র ৪ বছরে

ভূস্বামীদের দখলে থাকা জমি কেড়ে নিয়ে সরাসরি চাষীদের মাঝে বিলিয়ে দেন।

সাহেল অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার হচ্ছিল মরুকরণ। ১ কোটি গাছ লাগিয়ে সেই মহা দুর্যোগ প্রতিরোধ করেন।

পাকা সড়ক আর রেল লাইন নির্মাণ করে গোটা দেশটিকে একসূত্রে আবদ্ধ করেন।

নারী শিক্ষার্থিদের গর্ভকালীন ছুটি চালু এবং নারীদের প্রশাসনের উচ্চ পদে নিয়োগ এর ব্যবস্থা করেন।

বিদেশী সাহায্যের বিরোধিতা করেন এবং বলেন ” যে তোমাকে খাওয়ায়, সেই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে “।

আফ্রিকার দেশগুলিকে একাট্টা হতে আহবান জানিয়ে বলেন – ধনী এবং শোষকের ঋণ পরিশোধের জন্য গরীব এবং শোষিতের কোন দায় নেই।

সেনা সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট দোকানকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এটি ছিল দেশটির প্রথম সুপারমার্কেট ( অবশ্যই সরকারি মালিকানাধীন) ।

নিজ দপ্তরে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার বন্ধ করে দেন কারণ দেশের সিংহভাগ মানুষের জন্য ওই সুবিধা নেই এবং হাতে গোণা কিছু বুরকিনাবেস এটি ভোগ করে। বুরকিনা ফাসো এর নাগরিকদের বুরকিনাবেস বলা হয়।

সাংকারা বলেছিলেন – আমাদের বিপ্লবটা মানুষের সৃষ্টি থেকে আজ অব্দি যত অভিজ্ঞতা তা থেকে প্রেরণা নেয়। আমরা বিশ্বের সমস্ত বিল্পবের , তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত মুক্তি সংগ্রামের উত্তরাধিকারি হতে চাই।

ঔপনিবেশিকরা দেশটির নাম দিয়েছিল রিপাবলিক অফ আপার ভোল্টা। রাজধানী উয়াগাডুগু
৪ আগষ্ট ১৯৮৪ তে সাংকারা দেশটির নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম চালু করেন – বুরকিনা ফাসো ( অর্থাৎ সত মানুষের দেশ) ।

সাংকারার প্রিয় বন্ধু এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত সংগী ক্যাপ্টেন ব্লেইজ কমপ্যাওর পাশের দেশ আইভরি কোস্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের সহায়তায় ১৯৮৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয়। সাংকারার দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা করে হত্যা করা হয়।
সমস্ত জনমূখী প্রকল্প বাতিল করে বিদেশি, বিশেষ করে ফ্রান্সের জন্য ব্যাপক সুযোগের দ্বার খুলে দেওয়া হয়।
আফ্রিকার চে নামে খ্যাত সাংকারার হত্যাকারী ব্লেইজ কমপ্যাওর শীঘ্রই লুটপাট এর রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ব্যাপক গণ আন্দোলন হলেও পশ্চিমা সাহায্য নিয়ে ব্লেইজ ২৭ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশটিকে ছিবড়া করে ফেলে।
অবশেষে জনরোষ থেকে বাঁচতে আইভরি কোস্টে পালিয়ে যায়।
সাংকারা সহ অসংখ্য মানুষের হত্যা এবং লুটপাটের দায় থেকে বাঁচাতে আইভরি কোস্ট ব্লেইজকে নাগরিকত্ব দেয়ার ফলে ব্লেইজ এর বিচার করা যায় নি।

মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে সামরিক অভ্যুত্থান এর প্রচার বৃদ্ধি পায়, সাংকারা নির্ভীক, ঘোষণা করলেন – মানুষকে হত্যা করা যায়, আদর্শকে হত্যা করা যায় না।