ভাস্কর্য নিয়ে কী বলছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন?

লামিয়া নোশিন নকশি

‘আংশিক ভাস্কর্য নিয়ে কোনো বিতর্ক নাই, এটা জায়েজ’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান সিকদার
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান সিকদার এর সাথে কথা বলেছে জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘ভাস্কর্য আর মূর্তি এক না আলাদা, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিতর্ক আছে৷’’
তবে পূর্ণ প্রতিকৃতি না হয়ে অর্ধেক বা আংশিক ভাস্কর্য নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, এটা জায়েজ আছে, বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য
বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য, কুষ্টিয়া

ডয়চে ভেলে: ভাস্কর্য ও মূর্তি এক না আলাদা?
মাওলানা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান সিকদার: এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে৷ বিশেষ করে মিশরের কিছু আলেম কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য করেছেন৷ যদি এবাদতের উদ্দেশ্যে হয় তা হলো তো মূর্তি৷

আর এই ক্ষেত্রে সব মাজহাবই মুসলমানদের জন্য এটা হারাম বলছে৷ কারণ ইসলামের মৌলিক বিষয় হলো একত্ববাদ৷ মূর্তি একত্ববাদের বিরুদ্ধে যায়৷ আর ভাস্কর্য হলো তা, যা এবাদতের উদ্দেশ্যে নয়৷ কেউ বাসায় রাখার জন্য, কেউ স্মরণ করার জন্য ভাস্কর্য তৈরি করে৷ তবে এব্যাপারেও নানা মত আছে৷

পূর্ণ প্রতিকৃতি না হয়ে অর্ধেক৷ আবার শরীরের কোনো ভঙ্গি, যেমন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তার হাতের তর্জনি৷ এসবের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য নাই৷ এটা জায়েজ আছে৷ তবে পুরো শরীরের যদি ভাস্কর্য হয় সেটা নিয়ে নানা মত, বিতর্ক আছে৷

মিশরের আলেমরা অবশ্য স্মরণ বা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য পুরো শরীরের ভাস্কর্যকে জায়েজ বলেছেন৷ তবে কট্টরপন্থিরা এটা সমর্থন করেন না৷ তারা মনে করেন এটাকে কেন্দ্র করে মূর্তি পুজা শুরু হয়ে যেতে পারে।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কী?
বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর সাথে শরিক করবে না৷ ভাস্কর্য তো আর শরিক করার জন্য করা হয় না৷ ভাস্কর্য করা হয় কাউকে স্মরণ বা সম্মান দেখানোর জন্য৷ যেমন স্ট্যাচু অব লিবার্টি মানুষ দেখতে যায়৷ এখানে পর্যটনের একটা ব্যাপার আছে৷

এই বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অবস্থান কী?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই বিষয়ে আরো গবেষণা করছে৷ আরো তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে৷ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটও দেখতে হবে৷ সব মিলিয়ে আরো গবেষণা করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন একটা মতামত দেবে৷

শুধু মানুষ না সব প্রাণীর ভাস্কর্য বা মূর্তি নিয়েই বিতর্ক আছে?
আসলে শুধু মানুষ নয়, সব ধরনের প্রাণীর ভাস্কর্য বা মূর্তি নিয়েই বিতর্ক আছে৷ মাওলানাদের কেউ কেউ বলছেন যারা প্রাণীর ছবি আঁকবে বা মূর্তি বানাবে তারা কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি শাস্তি পাবে৷ তবে এর বিপরীতেও মাওলানাদের মতামত আছে৷ বিষয়টি তো বাংলাদেশে নতুন৷ তাই আমরা আরো গভীর গবেষণা করছি৷

মুসলিম দেশে নানা রকমের ভাস্কর্য

Flash-Galerie Obama besucht Indonesien

ইন্দোনেশিয়া

সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বাস যে দেশে, সেই ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শৈশবের ভাস্কর্য৷

Papst Franziskus besucht die Türkei 28.11.2014 Kirche in Istanbul

তুরস্ক

ইস্তাম্বুলে সেন্ট আনতুয়ান ক্যাথলিক চার্চের বাইরে পোপ জন পল ২৩-এর ভাষ্কর্য৷

Türkei Referendum Wahllokal in Istanbul

তুরস্ক

ইস্তাম্বুলে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য৷

Die Statue von Ghaemmagham Farahani in Teheran

ইরান

রাজধানী তেহরানে ঘায়েম মাঘাম ফারাহানির ভাষ্কর্য৷১৮৩৫ সালে মারা গেলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজসংস্কারক ফারাহানিকে এখনো এভাবে জনজীবনের অংশ করে রেখেছে ইরান৷

Iran Corona-Pandemie | Statue mit Maske

ইরান

গত মার্চ মাসে তাবরিজ শহরে তোলা ছবি৷ করোনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ভাস্কর্যের মুখেও পরানো হয়েছে মাস্ক৷

Libanon, Beirut: Alltag - Banken und Wirtschaft

লেবানন

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির ভাস্কর্য৷ ২০০৫ সালে এক গাড়িবোমা বিস্ফোরণে তিনি মারা যান৷ ঘটনাস্থলেই প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর ভাস্কর্য৷

Irak Sulaymaniyah Coronavirus

ইরাক

ইরাকের সুলেমানিয়া শহরের একটি ভাস্কর্য৷ করোনা ভাইরাসের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করতে ভাস্কর্যের মুখেও পরানো হয়েছে মাস্ক৷

Algerien Stauten Zerstörung durch Islamisten

আলজেরিয়া

আলজেরিয়ার সেতিফ শহরে আইন-আল-ফাওয়ারার ভাস্কর্য৷

BdTD Libanon Statue Hafenexplosion

লেবানন

বৈরুতে কাঁচ এবং বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি একটি ভাস্কর্য৷গত ৪ আগস্ট ভয়াবহ রাসায়নিক বিস্ফোরণে যে ভবনগুলো ধ্বংস হয় সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন লেবাননের শিল্পী হায়াত নাজের৷ সরকারবিরোধী আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এটি তৈরি করেছেন তিনি৷

Indonesien Obama Statue

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ছোটবেলার ভাস্কর্য৷

Iran | Statue von Abu Dschafar Muhammad ibn Muhammad Nasir ad-Din at-Tusi

ইরান

ইরানে কিংবদন্তি মুসলিম বিজ্ঞানী আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আদ-দীন-তুসির ভাস্কর্য৷

নিজের ছবি তোলা, ভিডিওতে নিজেকে দেখানো, টেলিভিশনে নিজেতে উপস্থাপন করা- সেব্যাপারে বিধান কী?

এই ব্যাপারগুলো নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে৷ হজের জন্য ছবি তোলা, জাতীয় পরিচয় পত্র এসব কাজে তো ছবি ছাড়া চলবেনা৷ এগুলোতে জরুরি কাজ৷ আমাদের আলেম ওলামারা তাই জায়েজ বলেছেন৷

উচ্চ আদালত বলেছেন ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি এগুলো ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক না৷ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মসজিদের ইমামদের এনিয়ে মানুষকে সচেতন করতে বলেছেন৷ আপনারা কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?

উচ্চ আদালত যে নির্দেশ দেবে তাতো সরকারের কাছে আসবে৷ সরকারের নির্দেশ তো অবশ্যই আমরা পালন করব৷

হিন্দুসহ আরো অনেক ধর্মে মূর্তি তৈরি এবং পূজা করার তো নিয়ম আছে৷ এখন আমাদের দেশে যদি ভাস্কর্য অথবা মূর্তি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মূর্তি নির্মাণ কি বন্ধ করে দেয়া হবে?

না অন্য ধর্মের মানুষকে মূর্তি নির্মাণে বাধা দেয়ার কোনো সুযোগ নাই৷ লা কুম দ্বীনি কুম ওয়াল ইয়া দ্বীনসহ আরো অনেক কথা আছে এনিয়ে৷ অন্যের ধর্মের ওপর বাধা দেয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নাই৷ এটা করা সমীচীনও হবে না৷ মুসলমানরা মহত্ব , ভালোবাসা, উদরতা দিয়ে অন্যদের জয় করবে৷

যেভাবে ভাস্কর্য আর মূর্তি ভাঙার দাবি হেফাজতে ইসলাম বা তাদের অনুসারীরা করছে, সেটা আরো বেড়ে গেলে ভবিষ্যতে অন্য ধর্মের মূর্তি তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি উঠবে কিনা?
না সেটা হবে না৷ হবে বলে আমি মনে করি না৷

ওয়াজে তো কেউ কেউ বলেন সব মূর্তি ভেঙে ফেলতে হবে...
সেটা যারা বলে তারা অজ্ঞতা থেকে বলে৷ আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে এখানে এখনো বসবাস করছি৷ এটাই আমাদের সংস্কৃতি৷ এই উপমহাদেশে যে দুই-একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে তার পিছনে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছে৷

মুসলিম দেশে কি ভাস্কর্য আছে?
হ্যাঁ আছে ৷ তুরস্ক, ইরান, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো অনেক মুসলিম দেশে ভাস্কর্য আছে৷ ইন্দোনেশিয়ায় তো প্রচুর পরিমাণে আছে৷ সেটাকে তারা পর্যটনের কাজে ব্যবহার করছে৷

ভাস্কর্য: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যা বলছেন

চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাসিমা হক

শিল্প এবং ধর্ম এখন সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক নাসিমা হক বলেন, শিল্পসাহিত্য বিকাশের এই যুগে ভাস্কর্য এবং মূর্তি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই৷ ভাস্কর্য অথবা অন্যান্য যে-কোনো শিল্প নিছকই একটি আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যম, যা একটি দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে৷ শিল্পকে এখন আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই৷

ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুকুল কুমার বাড়ৈ

উদ্দেশ্যটাই মুখ্য

ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুকুল কুমার বাড়ৈ বলেন, ‘‘সবই আসলে ভাস্কর্য৷ পার্থক্যের বিষয়টি চলে আসে সেটি কোন প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে৷ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য, তিনি আমাদের দেশের জন্য আইকনিক একজন ব্যক্তিত্ব৷ সুতরাং তাঁর ভাস্কর্যকে ধর্মীয়ভাবে দেখার সুযোগ আদৌ আছে বলে আমি মনে করি না৷’’

ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাসিমুল খবির

এ বিতর্ক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে

ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাসিমুল খবির বলেন, ‘‘ভাস্কর্য বা মূর্তির বিষয়টি বহু আগে থেকেই সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এমনকি ধর্মীয়ভাবে মীমাংসিত৷ এমনকি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতেও ভাস্কর্য আছে৷ সুতরাং আমরা বুঝতেই পারছি বাংলাদেশে এখন যে ঘটনাটি ঘটছে, সেটি একধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অহেতুক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পায়তারা ছাড়া কিছুই নয়৷’’

মৃৎমন্দির গুঞ্জন কুমার

সংজ্ঞাগত পার্থক্য সামান্য

ভাস্কর্য বিভাগের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী মৃৎমন্দির গুঞ্জন কুমার বলেন, ‘‘কে কীভাবে ভাস্কর্যটিকে উপস্থাপন করছে, সেটিই মুখ্য বিষয়৷ মূর্তি এবং ভাস্কর্যের মাঝে দ্বান্দ্বিক কোনো পার্থক্য নেই৷ অনেক ভাস্কর্য আছে যেটি মূর্তি নয়৷ আসলে মূর্তি যখন অনুভূতি বা নান্দনিকতার জন্য তৈরি হয় তখন তা ভাস্কর্য হয়ে ওঠে৷’’

লামিয়া নোশিন নকশি

শব্দ দুটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন

তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন লামিয়া নোশিন নকশি৷ তিনি বলেন, ‘‘চারুকলার একজন ছাত্রী হিসেবে আমার মাথায় প্রথমেই যা আসে সেটা হচ্ছে শব্দ দুটির প্রেক্ষাপট এবং অর্থের ভিন্নতা৷ ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে মূর্তি নির্মিত হয়ে থাকলেও ভাস্কর্যের ব্যাপারটি পুরোপুরি শৈল্পিক৷’’

সৌম্যক সাহা ধ্রুব

ভাস্কর্যে নান্দনিকতা থাকে

তৃতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী সৌম্যক সাহা ধ্রুব বলেন, ‘‘মূর্তি এমন এক ত্রিমাত্রিক গঠন, যা কোনো কিছুকে মূর্ত করে, এটি বিমূর্ত নয়৷ পাশাপাশি মূর্তি যখন উপাসনার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, তখন তাঁকে প্রতিমা বলা হয়৷ মূর্তি বা প্রতিমা ভাস্কর্যেরই প্রকারভেদ৷ ভাস্কর্যে মূলত নান্দনিকতাটাই প্রাধান্য পায়৷’’

পল্লব সমাদ্দার

ভাস্কর্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করে

ভাস্কর্য বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী পল্লব সমাদ্দার বলেন, ‘‘প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজন ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ভাস্কর্য তৈরি করে আসছে৷ ভাস্কর্য এবং মূর্তির মাঝে সামান্য কিছু পার্থক্য থাকলেও আমার মনে হয় দুটি বিষয় শেষ পর্যন্ত একই সুতোয় গাঁথা৷’’

তাহসিনা ফেরদৌস রিনিয়া

যাহা পানি, তাহাই জল

চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী তাহসিনা ফেরদৌস রিনিয়ার মতে, কিছু বিখ্যাত শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে ভাস্কর্য নাকি মূর্তি এ নিয়ে কিঞ্চিৎ দ্বন্দ্ব থাকলেও এই ধারণার ভিত্তি বা গোড়া কিন্তু একই৷ তিনি ভাস্কর্য এবং মূর্তির পার্থক্যের কথা এভাবে ব্যাখ্যা করেন, ‘‘সকল মূর্তিই ভাস্কর্য, কিন্তু সকল ভাস্কর্য মূর্তি না৷’’

নাবিলা তাবাসসুম

অমিল আছে, কিন্তু দ্বন্দ্বপূর্ণ নয়

চারুকলার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা তাবাসসুম বলেন, ‘‘মূর্তি অবধারিতভাবে মানুষ বা প্রাণীর আকৃতি হলেও ভাস্কর্যে প্রাণী বা কাল্পনিক ধারণা ফুটে উঠতে পারে৷ ভাস্কর্য দৃশ্যমান শিল্পের একটি শাখা, যা তৈরি করার পদ্ধতি মূর্তি থেকে ভিন্ন৷ ভাস্কর্যে শিল্পের নান্দনিকতার ছোঁয়া থাকবে এবং এর আকার যে-কোনো প্রকারের হতে পারে৷’’

তুরস্কে বঙ্গবন্ধুর এবং বাংলাদেশে কামাল আতাতুর্ক-এর ভাস্কর্য নির্মাণের যে কথা হচ্ছে তা কি ইসলামের নীতির বিরুদ্ধে যাবে?
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কোরান হাদিসের ওপর অনেক জ্ঞান আছে৷ তেলাওয়াতের দিক দিয়ে পৃথিবীর কোনো মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান তার সামনে কিছুই না৷ ওখানে অনেক ইসলামিক স্কলার আছেন৷ তাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই তিনি আলাপ আলোচনা করেছেন৷

বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে ব্যাখ্যা বা ফতোয় দেয়ার অধিকার কার? হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী না অনকোনো ইসলামি দলের?
না না না, নিশ্চয়ই না৷ এব্যাপারে তো হাইকোর্টের আদেশ আছে৷ তাতে বলা হয়েছে যারা ইসলামের ব্যাপারে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ তাদেরই এই অধিকার আছে৷ তবে আমাদের প্রস্তাব, জাতীয় পর্যায়ে একটা ফতোয়া বোর্ড থাকা দরকার৷ যারা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলামিক মতামত দেবেন৷ এটা জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে পর্যন্ত করা যেতে পারে৷ বাইরের লোক কেন ফতোয়া দেবে৷ সরকারের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ আলেমরা ফতোয়া দেবেন৷

ইসলামিক ফাউন্ডেশনেরও তো একটা ফতোয়া বিভাগ আছে৷ তারা কি দায়িত্ব নিতে পারে না?
এটা অনেক ছোট আঙ্গিকে আছে৷ এটাকে আরো বৃহত্তর আঙ্গিকে করা দরকার৷

ইসলামি রাষ্ট্র না হলে সেখানে ইসলামি আইন চলে কিনা?
ইসলামি রাষ্ট্র না হলে ইসলামি আইন কীভাবে আসবে? যারা ইসলামি আইনের কথা বলেন তাদের অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে হবে৷ তারপরে সংসদে পাস করবে৷ তারপরে ইসলামি আইন চালুর প্রশ্ন আসে৷

দেশে তো অনেক আগে থেকেই তো অনেকের ভাস্কর্য আছে৷ হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে কেন কথা উঠল? এটা কি ধর্মীয় না রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে?
আমার কাছে মনে হয় এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে৷ আমরা হিসাব করে দেখেছি দেশে চার থেকে পাঁচ হাজার ভাস্কর্য আছে৷ আক্রমণ শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপরে৷ এটা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ৷ বঙ্গবন্ধু তো আমাদের হৃদয়ে৷ তিনি তো আমাদের জাতির পিতা৷ তাই যারাই এটা করছে তারা উদ্দেশ্যমূলভাবে করছে, না কোনো শক্তির স্বার্থে এটি করছে কিনা তা দেখার বিষয় আছে৷ আমার কাছে বিষয়টা ঘোলাটে মনে হচ্ছে৷