জবানবন্দিতে যা জানালো ফারদিন

প্রেমের অভিনয়ে এবং ভালোবাসার প্রতারণায় ধানমণ্ডির মাস্টার মাইন্ড স্কুলের ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনকে খালি বাসায় ডেকে নেয় ফারদিন ইফতেখার দিহান (১৮)। সেখানেই আনুশকাকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ করে ফারদিন। ফারদিন-আনুশকার প্রেমের সম্পর্ক মাত্র অল্প কয়েকদিনের।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনুশকাকে ধর্ষণের পরিকল্পনা আগেই করেছিল ফারদিন। তাদের উভয়ের মধ্যে চেনাজানা এবং প্রেমের সম্পর্ক হয়েছে খুব সম্প্রতি। প্রায় দুই থেকে তিন মাস আগে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

যেটা তাদের উভয় পরিবারের কেউ জানতো না। ফারদিন এবং আনুশকাদের আলাদা একটি গ্রুপ ছিল যাদের কম-বেশি অনেকেই তাদের প্রেমের বিষয়টি জানতো।

সূত্র জানায়, ফারদিন অনেকটা আনুশকার রুপের মোহে পড়েছিল। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ধর্ষণের পরিকল্পনা থেকেই ডাকা হয় শিক্ষার্থী আনুশকাকে। ওদিকে গতকাল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ঘটনার আদ্যপান্ত বর্ণনা করেছে।

ধর্ষণের মূল পরিকল্পনাকারী ফারদিন বাবা-মা গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে যাওয়ায় গ্রুপ স্টাডির নাম করে আনুশকাকে ফোন করে কলাবাগান লেক সার্কাসের খালি বাসায় ডেকে নেয়।

আনুশকা যদি কোনো কারণে শারীরিক সম্পর্ক করতে রাজি না হয় সেজন্য আগে থেকেই কোমল পানীয়ের সঙ্গে অচেতন করার ওষুধ মিশিয়ে রাখে ফারদিন।

পরবর্তীতে কৌশলে সেটা আনুশকাকে খাইয়ে দেয়। এ সময় আনুশকা একাধিকবার তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। এবং উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।

সূত্র জানায়, দৈহিক সম্পর্কের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী আনুশকা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। পরবর্তীতে কি করবে বুঝতে না পেরে ফারদিন তার তিন বন্ধুকে ফোন করে বাসায় ডেকে আনে।

এবং আনুশকার এক মেয়ে বান্ধবীকে ফোন দিয়ে অচেতন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানায় ফারদিন। ধর্ষণের এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ফারদিন এবং তার বন্ধুরা মিলে হাসপাতালে নিয়ে যায় আনুশকাকে।

হাসপাতালে নেয়ার পথে ফারদিন নিজেই আনুশকার মায়ের মুঠোফোনে ফোন দিয়ে জানায় সে অচেতন হয়ে পড়েছে। এই সময়ের মধ্যে ফারদিন তার মুঠোফোন একাধিকবার অন-অফ করেছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।

এক পর্যায়ে আনুশকার মাকে জানায় আনুশকা মারা গেছে। ধর্ষণের ঘটনায় ফারদিন একাই অংশ নিয়েছে। সরজমিনে দেখা গেছে ধানমণ্ডির ১৩ নম্বর রোডের ১৭ নম্বরের বি/৪ এর বাসায় মেয়েকে হারিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন আনুশকার বাবা।

তার বাবা আল আমিন বলেন, আনুশকা বেলা সাড়ে ১১টায় তার মাকে ফোন দিয়ে কোচিংয়ের পেপার্স আনতে বাইরে যাওয়ার কথা জানায়। দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে ফারদিন আমার স্ত্রী শাহনূরীকে ফোন দিয়ে জানায় আনুশকা তার বাসায় গিয়েছিল।

সেখানে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। এদিকে আনুশকার মা শাহনূরী আমিন বলেন, আমার মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছে।

যেটা পুরোটাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। দুপুরে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আনুশকা আমাকে গ্রুপ স্টাডি এবং ওয়ার্কসিট আনার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাটি সম্পন্ন করেছে।

তিনি বলেন, আনুশকা ছিল খুবই শান্ত স্বভাবের। বাধ্য ও অনুগত। ওর খুঁটিনাটি সকল বিষয় আমার এবং ওর বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতো। ফারদিনের সঙ্গে ওর প্রেমের সম্পর্ক থাকলে আমরা আগে থেকেই বুঝতে পারতাম। তাছাড়া ওরা দুই বোন একই কক্ষে ঘুমাতো।

আনুশকার বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চিকিৎসক বানাবেন। কিন্তু আনুশকা বরাবরই স্থপতিবিদ হতে চেয়েছিল। আনুশকার মা বলেন, আমার মেয়ের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি।

কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে আনুশকার ছোটো বোন পিয়ানা। পিয়ানা বলে, গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আর আপু পরিকল্পনা করেছিলাম শুক্রবার ছুটির দিনে বিরিয়ানি রান্না করবো। আপু পোলাও খেতে ভালোবাসতো।

বিরিয়ানি রান্না করে বাসার সবাইকে এবং আপুর স্কুলের বন্ধুদেরকে খাওয়ানোর কথা ছিল। আপুর সঙ্গে আর কখনোই বিরিয়ানি রান্না করা হবে না।

জানা গেছে, আনুশকার বাবা নবাবপুরের ব্যবসায়ী এবং মা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কম্পিউটার অপারেটর। তারা ধানমণ্ডি-১৭ (নতুন)তে ভাড়া বাসায় থাকেন।

এদিকে ময়নাতদন্তের পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, যোনি ও পায়ুপথে আঘাত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা গেছে।

আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই মৃত্যু হয়েছে আনুশকার। যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথ- দু’দিক দিয়েই রক্তক্ষরণ হয়েছে। চেতনানাশক কোনো কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি-না সেজন্য নমুনা সংগ্রহ ও ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তি ছিল কিনা জানতে ডিএনএ নমুনা এবং ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার ফারদিন ইফতেখার দিহান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

গতকাল বিকালে মামলাটির এজাহার আদালতে আসে। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ মামলার এজাহার গ্রহণ করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৬শে জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।

পড়ুনঃ

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *