DMCতে ক্লাস করে বুঝতে পারলাম চিকিৎসা বিজ্ঞান কতটা বিস্তৃত ও মজার একটা বিষয়

স্কুল জীবন থেকেই আমি খুব সাধারণ ছাত্র ছিলাম, পড়াশোনা করতে ভালো লাগতো না মোটেও। কিন্তু মানুষকে পড়াতে খুব মজা লাগতো। কলেজ জীবনেও নিজের বন্ধুদের পড়াতে চেষ্টা করতাম, ওরা পড়তে না চাইলেও পড়াতাম।

অন্যকে পড়ালে একটা লাভ আছে, নিজের পড়াটাও হয়ে যায়, আবার জ্ঞানটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। কলেজ জীবন শেষ করার পরপরই আম্মুর ইচ্ছাতেই মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম।

অনেক চেষ্টা করেছি তখন। আমি জানতাম যেকোন একটি সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়া সত্যিই অনেক কঠিন।

তারপরও মনের অগোচরে ডিএমসিয়ান হওয়ার স্বপ্ন বাসা বাঁধতে শুরু করেছিলো, কিন্তু জাতীয় মেধায় ৪র্থ হওয়াটা ছিল সত্যিই কল্পনাতীত সাফল্য।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে ক্লাস শুরুর পর একটু একটু করে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম চিকিৎসা বিজ্ঞান আসলে কতটা বিস্তৃত ও মজার একটা বিষয়।

কিন্তু আমাদের দেশে মেডিকেলে পড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেমন যেন এক অনীহা কাজ করে।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বেশ বড় একটা অংশ থাকে যারা অনিচ্ছাসত্বে পড়তে এসে পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। মুদ্রার অপর পিঠ ও কিন্ত কম দেখা যায় না।

ভর্তি যুদ্ধে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই শুধুমাত্র সঠিক দিকনির্দেশনা আর আন্তরিক অনুপ্রেরণার অভাবে “আমার মত ছাত্রকে দিয়ে মেডিকেলে পড়া হবে না ”

এ ভেবে পিছিয়ে যায়। অথচ তাদের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে ছিল অদূর ভবিষ্যতের এক সুদক্ষ চিকিৎসক। চারপাশের বিভিন্ন ঘটনায় বারবারই এই চিন্তা গুলো মাথাচাড়া দিয়ে যেত।

নিজ জেলার জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল আমার অনেকদিনের। প্রথম পেশাগত পরীক্ষার পর নিজ উদ্যোগে খুলনায় পড়ানো শুরু করলাম আমি।

আমার ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক হবার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অনুপ্রেরণাস্থল হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো,প্রাণের শহর খুলনা থেকে যেন বেরিয়ে আসতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নামকরা সব চিকিৎসক তার বুনিয়াদ গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করা।

আমি সবসময় মনে করি,” A good teacher explains, a great teacher inspires.” ভর্তিযুদ্ধের কঠিন সময়টা দিয়ে যাওয়া আমার ছাত্রদের অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য,মানুষের চেষ্টা আর পরিশ্রমের কাছে ভর্তি পরীক্ষা যে দুঃসাধ্য কিছুই নয় তা বোঝানোর জন্য মেডিকেল জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতি বৃহস্পতি- শুক্রবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া আসা করতাম আমি।

আমার এই পরিশ্রম বিফলে যায়নি। আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আজ রয়েছে অসংখ্য মেডিকেল শিক্ষার্থী যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশের প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজে।

তাদের হাসিমুখ দেখে প্রতিনিয়ত আমার মনে হয় সার্থক অনুপ্রেরণাদায়ী হতে পারার চাইতে আনন্দের বুঝি আর কিছু নেই।

কিন্তু এতকিছুর ভিড়েও নিজের পড়াশোনায় কখনো ফাঁকি দেই নি আমি, হতাশাও আসতে দেইনি জীবনে। প্রতিদিন যত কষ্টই হোক না কেন কমপক্ষে ২ ঘন্টা পড়াশোনা করতাম আমি।

এই নিয়মানুবর্তিতাই হয়তো আমাকে এনে দিয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় যথাক্রমে চতুর্থ ও দশম স্থান সহ তিনটি পেশাগত পরীক্ষায় ৬টি বিষয়ে অনার্স মার্ক ও ৩৯ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সৌভাগ্য, যা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের অন্যতম অর্জন।

কিন্তু আমি মনে করি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া এই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও তার প্রাঙ্গণে চিকিৎসা পাওয়া অসংখ্য রোগী, যাদের নিয়ে কাজ করতে করতে প্রতিনিয়ত শিখেছি মানুষের ভালোবাসার চেয়ে একজন চিকিৎসকের জীবনে আর কোন অর্জন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেনা।

মেডিকেল জীবনে চলতে চলতে শিক্ষা জীবনের একটা অংশ পার করেছি কিন্তু সামনে পড়ে আছে আরো বহুদূর পথ। আপাতত নিজ এলাকায় বিসিএস চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করতে চাই আমি।

পাশাপাশি কার্ডিওলজিতে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্ত শুধু একজন ভাল চিকিৎসক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, পাশাপাশি একজন ভালো শিক্ষক হয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হতাশা কাটাতে সহযোগিতা করাও আমার জীবনের অন্যতম এক স্বপ্ন।

যার জন্য একাডেমিক স্বচ্ছ ধারণার পাশাপাশি রোগী ও শিক্ষার্থী উভয়ের প্রতি সহানুভূতি খুব বেশি প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি। স্বপ্ন সত্যি করার লক্ষ্য আঁকড়ে ধরেই পাড়ি দিতে চাই সামনের পথ।

ডাঃ হাদিউর রহমান সিয়াম
বিসিএস (স্বাস্থ্য)
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (কে-৭০)
সেশনঃ ২০১২-২০১৩