আমি ও আমার ডাক্তার মেয়েরা

আমি যখন ফিফথ ইয়ারে পড়ি তখন আমার বড় মেয়ে সিফাতের জন্ম। আমার লেবার পেইন শুরু হবার আগের দিন আমি ক্লাসে যাই, গাইনীর সুরাইয়া জাবীন ম্যাম, ওভারিয়ান টিউমারের উপর লেকচার নিলেন। ঐদিন বিকেলেই আমি ম্যাডামের ক্লিনিকে গিয়ে ভর্তি হলাম। ম্যাডাম তো অবাক।

ম্যাডাম বললেন, তোমাকে না সকালে ক্লাসে দেখেছিলাম, তুমি এখানে কি কর। সিফাতের জন্মের মাত্র ৯ দিন পরই আমি আবার ওয়ার্ডে হাজির, তাও ইভিনিং ওয়ার্ড, সবাই আমাকে দেখে বলাবলি করছিলো এই মেয়ে এখানে কিভাবে। আজকে আমার সেই ছোট্ট মেয়ে এখন ডিএমসিতে এসিস্ট্যান্ট রেজিস্টার হিসেবে কাজ করছে। কার্ডিওথোরাসিক সার্জারিতে এম এস কোর্সে আছে বর্তমানে।

ইন্টার্নি শেষের পরদিনই অনারারি হিসেবে যোগ দিলাম পিজি হাসপাতালে, পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্টে, বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ এম আর খান স্যারের আন্ডারে। স্যার আমাকে প্রচুর কাজ দিতেন। একদিন আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম স্যার আমাকে এত কাজ কেন দেন ? স্যার বললেন, তুমি পারবা বলে দেই। এরকম ছোট খাট অনেক প্রেরণাই আমি স্যারের কাছে পেতাম প্রতিনিয়ত।

এফসিপিএস পাশ করার পর ঢাকা মেডিকেলে রেজিস্টার থাকাকালীন মেডিকেল এডুকেশন প্রোগ্রামে আমার বিদেশে যাবার সুযোগ হয়েছিলো। সব কিছু মোটামুটি নিশ্চিত ছিলো, কিন্তু তখন আমার দ্বিতীয় সন্তান মাশিয়াতের জন্ম হয়। আমার আর যাওয়া হলো না। কিন্তু ভাগ্যের কি লিখন, আল্লাহ তায়ালা কার ভাগ্যে যে কখন কি লিখে রেখেছেন তা কেউ জানে না।

আমার তিন মেয়ের মধ্যে কেবল সেই এখন বিদেশে লেখাপড়া করছে, আমেরিকার হিউস্টনে, এম ডি এন্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারে মাস্টার্স কোর্সে আছে, পড়ালেখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিতর্কেও সে বেশ কয়েকবার অংশ নিয়েছে।

পরিবারের পাশাপাশি নিজের পড়ালেখা চালিয়ে গিয়েছি সবসময়। চ্যালেঞ্জ নেবার মানসিকতা, জীবনের চড়াই-উতরাই দেখে ভয় না পাওয়া ,এসব মূলত আমি আমার মার কাছ থেকে শিখেছি। একচান্সে এফসিপিএস পাশ করলাম পেডিয়াট্রিক্সে, ডাক্তারি পড়ার শুরু থেকেই এই বিষয়টির প্রতি আগ্রহ ছিলো।

পেডিয়াট্রিক্সে এম ডি পাশ করে দেখলাম নবজাতক শিশুর পরিচর্যার প্রতি আলাদা একটা টান কাজ করছে। তাই পরবর্তীতে নিওনেটালজীতেও এমডি কমপ্লিট করি। পেশার প্রতি আমার ভালোবাসা সর্বোচ্চ। প্রতিটা রোগী দেখার সময় মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটা বিষয় খেয়াল করি, যার ফল স্বরূপ রোগীদের ভালোবাসাও পেয়েছি প্রচুর।

পরিবারের সবার সাথে কোথাও কেনাকাটা করতে গেলে অনেক সময়ই আগের রোগি এসে দেখা করেন, আমার প্রতি তাঁদের ভালোবাসা দেখে তখন নিজের জীবনকে ক্ষণিকের জন্য হলেও সার্থক মনে হয়।

আমার সবচেয়ে ছোট মেয়ে মুশাররাতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট যেদিন দিবে সেদিনের কথা। মা মেয়ে ল্যাপটপের সামনে বসে আছি, আমার তো চোখ বন্ধ। ঢাকায় চান্স পেয়েছে দেখে আমি তো বিশ্বাসই করিনি প্রথমে।

মা মেয়ে একজন আরেকজনকে ধরে চিৎকার দিলাম। আমি যেই মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করেছি, আমার মেয়েও সেই মেডিকেলের ছাত্রী – আমার জন্য এরচেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে।

তবে এত কিছুর জন্যে সবার প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই মহান আল্লাহকে। আর অবশ্যই আমার সন্তানদের পিতাকে, সবসময় আমার পাশে থেকে আমাকে এগিয়ে যাবার যে অনুপ্রেরণা তিনি দিয়েছেন তা অকল্পনীয়। আমার পরে আমার মেয়েদেরকেও পড়লেখার ব্যপারে খুবই উৎসাহ দেন তিনি। কোনো কারণে যদি রাতের বেলা ইমার্জেন্সি ডিউটিতে কল আসে, তাহলে তিনি গাড়ি পর্যন্ত পৌছে দেন।

আমি আসা পর্যন্ত বসে থাকেন, যখন আমি এসে দরজায় নক করবো, তখন যাতে তিনি নিজে দরজা খুলে দিতে পারেন। আমার ভাই-বোন সবাই সব সময় পাশে থেকেছেন আমার। বিশেষ করে আমার কলিগদের কথা বলতেই হবে। পুরো ক্যারিয়ারেই সবসময় তাঁদের পাশে পেয়েছি।

পরিশেষে আমি বলতে চাই নিজের কাজের প্রতি, পেশার প্রতি সব সময় একটা ভালোবাসা কাজ করেছে আমার। যার কারণে আমি স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে নবজাতক পরিচর্যার উন্নতির জন্যে কাজ করে যেতে, নিরলসভাবে।

Prof .Dr Begum Sharifun Naher
MBBS,FCPS, MD (Paed) MD(Neonatology)
Trained in Neonatology (Japan)
Child health specialist and Neonatologist
Prof and Head
Dept of Neonatology
SSMC Mitford Hospital
SS-08

Musharrat Rabbani
SS-45

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *