রাবি IR বিভাগে নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়

রাবি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ru rajshahi university

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।

বিভাগের সভাপতির ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতিশোধ পরাণয়তা ও পছন্দের শিক্ষার্থীকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্যই এমন ফল বিপর্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

গত ৯ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর একটি অভিযোগপত্র দেন শিক্ষার্থীরা। তাতে সভাপতির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ এনেছেন শিক্ষার্থীরা।

এসব অভিযোগ তদন্ত করে সভাপতির শাস্তি ও মাস্টার্সের ফলাফল পুর্নমূল্যায়ন করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক বিভাগের সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর
ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী

গত ১১ নভেম্বর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ফলাফল ঘেঁটে দেখা যায়, বিভাগের ২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অনার্সে ১১ জনের ৩.৫০ এর ওপরে ফলাফল থাকলেও মাস্টার্সে শুধু ৩ জন শিক্ষার্থীই ৩.৫০ এর ওপর পেয়েছেন।

এদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান মুন্নার অনার্সে ৩.৩০ পেয়ে ২১তম হলেও মাস্টার্সে ৩.৫৩ পেয়ে হয়েছেন প্রথম।

তবে অনার্সে ৩.৮২ পেয়ে প্রথম হওয়া ও স্বর্ণপদকজয়ী শিক্ষার্থী মোস্তাকিম খান এবং ৩.৭৬ পেয়ে অনার্সে দ্বিতীয় হয়ে ইউজিসি বৃত্তি অর্জনকারী শিক্ষার্থী সুলতান কবীরের মাস্টার্সে ফলাফল ৩.৫০ এর নিচে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সভাপতির পছন্দের ৩ জন শিক্ষার্থীই মাস্টার্সে ৩.৫০ এর ওপর পেয়েছেন এবং বিভিন্ন পরীক্ষার আগে তাদের প্রশ্নও বলে দিতেন সভাপতি।

অভিযোগপত্রে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বিভাগের শিক্ষক না হয়েও (ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রেষণে আসেন) মাস্টার্সের ৮টি কোর্সের মধ্যে ৫টি কোর্সেই পরীক্ষক ছিলেন ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এগুলোর মধ্যে ২টি কোর্সের একটিতে মাত্র ৩টি ক্লাস এবং আরেকটিতে একটিও ক্লাস নেননি। ৪টি কোর্সের ২০ নম্বরের ইনকোর্স নেয়ার নিয়ম থাকলেও পরীক্ষা ছাড়াই এতে নম্বর বসানো হয়েছে।

এছাড়া বিভাগের অন্য শিক্ষকরা থাকতেও মাস্টার্সের সবগুলো থিসিসের সুপারভাইজার হয়েছিলেন এবং পরে খেয়ালখুশি মতো থিসিস পরীক্ষণে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের নিজের মতামত অনুযায়ী নম্বর দিতে বলেন।

এই কারণে দুজন শিক্ষক থিসিস পরীক্ষণে অস্বীকৃতি জানান।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেন।

শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত শ্রেণি প্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে পছন্দের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মুন্না (যিনি অনার্সে ৩.৩০ পেয়ে ২১তম হয়ে মাস্টার্সে ৩.৫৩ পেয়ে প্রথম হয়েছেন) এবং শারমিন আক্তার জ্যোতিকে প্রতিনিধি করে দেন।

এই দুজনের সহযোগিতায় ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বিভাগের শিক্ষার্থীদের চাপ প্রদান ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।

শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন নিজের গড়া সংগঠন ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’র অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করতেন।

তার নিজের লেখা বই ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ শিক্ষার্থীরা না কিনলে ফর্ম ফিলাপে স্বাক্ষর করতেন না সভাপতি ড. মামুন।

এছাড়া থিসিসের কাজে কক্সবাজার গেলে নিজের পরিবার, শ্যালক, শ্যালিকার ভ্রমণের টাকা ব্যয় করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, গত ৯ ডিসেম্বর বিশ^বিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর অভিযোগপত্র দিয়ে মাস্টার্সের ফলাফল পুর্নমূল্যায়ন ও অভিযোগের তদন্তের দাবি জানান।

এছাড়া ১২ ডিসেম্বর রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আব্দুস সোবহানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব অভিযোগ জানান।

অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের একজন মাহমুদা মিতুল ইভা বলেন, মাস্টার্সে যারা প্রথম তিন অবস্থানে আছেন, তাদের সঙ্গে সভাপতির খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

এদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান মুন্না অনার্সে ৩.৩০ পেয়ে ২১তম হলেও মাস্টার্সে প্রথম হন। আমাদের নির্বাচিত শ্রেণি প্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে তাকে প্রতিনিধি করেন সভাপতি স্যার। শোনা যায়, শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান সবাইকে বলে বেড়ান তিনি যেকোনো ভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন, তাতে যতটাকা লাগে লাগুক।

এতেই স্পষ্ট বোঝা যায় সভাপতির এত অনিয়ম করার কারণ কী? হতে পারে তার পছন্দের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতেই এসব করছেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি কোর্সে দুজন পরীক্ষক থাকেন।

সুতরাং এখানে কাউকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্য পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। অনার্সে যারা ফল ভালো করে মাস্টার্সে ভালো করতে পারে নি, তারা হয়ত একজনের ফলাফল দেখে ক্ষোভ ও ঈর্ষা হয়েছে।

সেই ঈর্ষা থেকেই হয়ত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করা হয়েছে।

ইনকোর্স ছাড়াই ফাইনাল পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। আমি তাদের পরীক্ষা নিয়েছি।

তাদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে, রেজাল্টও হয়ে গেছে। এখন এসব অভিযোগ করলে তো তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, পদ্ধতিগতভাবে কোনো ত্রটি হয়নি, সব নিয়ম মেনেই হয়েছে। এসব অভিযোগ করে আমার ইমেজ নষ্ট করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি, গ্রুপিং আছে। শিক্ষার্থীদের মিসগাইড করা হয়েছে। তারা নিশ্চই তাদের ভুল বুঝতে পারবে।