লিও তলস্তয়ের সাহিত্যচিন্তা: বিশ্বসাহিত্য ভাষণ ৩

লিও তলস্তয় ৩

লিয়েভ নিকোলায়েভিচ তলস্তয়। অনেকে ডাকেন লিও তলস্তয়। আমি ডাকি মহাত্মা গান্ধীর জনক। গান্ধী তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ছাত্রলীগ করতেন। একদিন দৈবক্রমে একটি চিঠি পড়েন। চিঠিটি লিখেছিলেন তলস্তয়, বিপ্লবী তরকনাথ দাসকে (চিঠিটির নাম ছিলো— ‘আ লেটার টু আ হিন্দু’)।

চিঠিটিতে তলস্তয়, কীভাবে অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে, ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা আদায় করা যায়, তার কিছু উপায় বাতলে দিয়েছিলেন। চিঠিটি পড়ে, গান্ধী তলস্তয়ের শান্তিবাদের প্রেমে পড়েন। তিনি তলস্তয়ের ‘আ কিংডম অব গড…’ রচনাটি যখন পড়েন, তখন মোটামুটি নিশ্চিত হন যে— এ প্রক্রিয়ায় বড় রাজনীতিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।

তলস্তয়ের শান্তিবাদের কাছে, ভারতের স্বাধীনতার এ ঋণ ভারতীয়দের মনে আছে কি না জানি না, তবে গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে তলস্তয়ের এ ঋণ স্বীকার করেছিলেন।

দস্তয়েভস্কির মতো তলস্তয়ও খ্রিস্টান ছিলেন, এবং প্রভাবিত ছিলেন পশ্চিমা পড়াশোনো দ্বারা। তিনি শোপেনহাওয়ারের ভক্ত ছিলেন। শোপেনহাওয়ারের ‘দা ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড রেপ্রেজেন্টেশন’ পড়ে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন নতুনভাবে। তলস্তয় তাঁর ‘কনফেশন’-এর ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে, শোপেনহাওয়ারের উইলের শেষ অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করেছিলেন।

তলস্তয়ের খ্রিস্টধর্মপ্রীতি, তাঁর ‘হোয়াট আই বিলিভ’ রচনায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। তিনি শান্তিবাদ এবং নন-ভায়োলেন্সের ধারণাও নিয়েছিলেন যিশু খ্রিস্টের শিক্ষা থেকে। সে হিশেবে আমি মনে করি, ভারতের স্বাধীনতার পেছনে কোনো ধর্মের অবদান থাকলে, সেটা হিন্দু ধর্মের নয়, খ্রিস্ট ধর্মের (যদিও নরেন্দ্র মোদী আমার এ কথার সাথে একমত পোষণ করবেন না)। তলস্তয়ের কিংডম অব গড পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি খ্রিস্টান চার্চগুলোকে বেশ সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর ধারণা, চার্চগুলো নিজেদের স্বার্থে খ্রিস্টের শিক্ষাকে বিকৃত করেছে। পৃথিবীতে ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্টান্টরা যে পরিমাণ খুনোখুনি করেছে, তাতে তলস্তয়ের সন্দেহকে আমার যৌক্তিকই মনে হয়। তলস্তয় বিশ্বাস করতেন, যে-ব্যক্তি দাঙ্গাহাঙ্গামা করে, সে কখনো খ্রিস্টান হতে পারে না। এজন্য তিনি সেনাবাহিনীর চাকুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, এবং হয়ে উঠেছিলেন এনার্কিস্ট।

এনার্কিস্টের বাংলা কারা যেন করেছে নৈরাজ্যবাদী। আমি এর সাথে একমত নই। বাংলা ভাষায় নৈরাজ্য শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। নৈরাজ্য শব্দটি শুনলেই মানুষ ভাবে, কোথাও বুঝি মারদাঙ্গা খুনোখুনি হচ্ছে। এজন্য নৈরাজ্যবাদকে আমি ‘এনার্কিজম’-এর সঠিক বাংলা অনুবাদ মনে করি না। এনার্কিজম হলো কারও কর্তৃত্ব না মানা। এনার্কিজম মানুষকে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলে।

মানুষ কোনো রাজা বাদশার অধীনে বাস করবে না, বরং মানুষ এমনভাবে চলবে, যেন তার কখনো রাজা বাদশার দরকার না হয়— এনার্কিজম এটিই শিক্ষা দেয়। এনার্কিজম বলে— তুমি তোমার স্বাধীনতা এমনভাবে উপভোগ করো, যেন আরেকজনের স্বাধীনতা খর্ব না হয় (অবশ্য একই কথা বার্ট্রান্ড রাসেলও গণতন্ত্রের প্রসঙ্গে বলেছিলেন)।

কিন্তু ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটি শুনলে কি এনার্কিজমের প্রকৃত চেতনা টের পাওয়া যায়? যায় না। এগুলো হলো ভাষার দূষণ। কারণ, এনার্কিজম ক্ষমতাধর মানুষদের শত্রু। তারা চায় না শব্দটির একটি ভালো অনুবাদ বাংলা ভাষায় থাকুক। এজন্য তারা তাদের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে, এ ধরণের কিছু দূষিত অনুবাদ বাংলা ভাষায় টিকিয়ে রেখেছে।

শুধু বাংলা ভাষা নয়, পৃথিবীর আরও নানা ভাষায় এ ধরণের দূষিত অনুবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। আমার প্রস্তাব হলো— এনার্কিজমের বাংলা হওয়া উচিত ‘স্বাধীনতাবাদ’। এজন্য তলস্তয়কে আমি নৈরাজ্যবাদী না বলে, বলবো স্বাধীনতাবাদী।

তাঁর লেখায় ফরাসি এনার্কিস্টদের প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে যোশেফ প্রোদৌনের। প্রোদৌনের রাজনীতিক দর্শন, তলস্তয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিলো। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ নামে তাঁর যে বিখ্যাত উপন্যাসটি আছে, সেটির নামও প্রোদৌন থেকে নেয়া। প্রোদৌন লিখেছিলেন ‘La Guerre et la Paix’, যার ইংরেজি অনুবাদ হলো ‘War and Peace’, এবং এটিকে তলস্তয়, পরবর্তীতে তাঁর উপন্যাসের নামকরণে ব্যবহার করেছিলেন।

তলস্তয় শিক্ষাবিদও ছিলেন। প্রোদৌনের কিছু শিক্ষা-সংক্রান্ত ধারণা তিনি নিজের ধারণার সাথে মিশিয়েছিলেন, এবং কৃষকদের সন্তানদের জন্য, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তেরোটি ইশকুল (যদিও পুলিশের উৎপাতে ইশকুলগুলো তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পুলিশের সন্দেহ ছিলো, ইশকুলগুলো নিয়ে তলস্তয়ের নিশ্চয়ই কোনো বদমতলব আছে)।

তলস্তয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন, এবং পড়েছিলেন আইন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো মাঝপথে ছেড়ে দেন। পড়াশোনা তাঁকে দিয়ে হবে না, এমনটিই মন্তব্য করেছিলেন তাঁর শিক্ষকেরা। দস্তয়েভস্কির মতো তিনিও জুয়াড়ি ছিলেন, এবং জুয়া খেলে নিঃস্ব হওয়ার পর যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। লেখালেখির শুরুও তখনই।

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘চাইল্ডহুড’। এটি তাঁর নিজের শৈশবেরই আত্মজীবনী। নিকোলেঙ্কা নামের এক বালককে দিয়ে, এ উপন্যাসে তিনি বর্ণনা করেছেন তাঁর শৈশবকে। তলস্তয়ের বয়স তখন মাত্র তেইশ। উপন্যাসটি সাড়া ফেলেছিলো, এবং নজরে পড়েছিলো ইভান তুর্গেনেভের। তুর্গেনেভ মন্তব্য করেছিলেন, এ তরুণ একদিন রুশ সাহিত্যের বড় লেখক হবে।

‘চাইল্ডহুড’ ছিলো তাঁর পরবর্তী দুইটি উপন্যাসের প্রথম পর্ব মাত্র। এরপর তিনি লিখেন ‘বয়হুড’, এবং ‘ইয়োথ’। তিনটি উপন্যাসই লিখা হয়েছিলো ‘এক্সপ্রেশোনিস্ট’ স্টাইলে। কিছু সত্য, কিছু কল্পনা, আর কিছু আবেগের মিশ্রণ। তবে উপন্যাস তিনটির মান নিয়ে তলস্তয় সুখী ছিলেন না। এ নিয়ে তলস্তয় একসময় আক্ষেপ করেছেন।

তবে তাঁকে দেবতা বানিয়েছিলো ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। উপন্যাসটি নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে লেখা। জারিস্ট রাশিয়ায় নেপোনিয়ন যুগের যে-প্রভাব পড়েছিলো, তা এ উপন্যাসে তলস্তয়, পাঁচটি অভিজাত রুশ পরিবারের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন (যদিও তলস্তয় এটিকে উপন্যাস হিশেবে দাবি করেন নি। তাঁর দাবি ছিলো, এটি হোমারের ইলিয়াড ঘরানার মহাকাব্য)।

উপন্যাসটি লিখতে তিনি অনুকরণ করেছেন শোপেনহাওয়ার, এবং ভিক্টর হুগোকে। শোপেনহাওয়ারের ব্যাপারটি তলস্তয় নিজেই স্বীকার করেছিলেন, শেনশিনকে লেখা একটি চিঠিতে। শেনশিন বললে হয়তো অনেকে চিনবেন না, তাঁর আসল নাম আফানাসি। আফানাসিকে তলস্তয় জানিয়েছিলেন— আমি ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ যা বলতে চেয়েছি, শোপেনহাওয়ার তা ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইলে বলে গেছেন।

এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। যাদের শোপেনহাওয়ার পড়া আছে, তাদের পক্ষে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর প্রশংসা করা কঠিন হবে। এজন্য সম্ভবত, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-কে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে হয় নি।

কিন্তু আমাদের কাওরানবাজার হককে দেখলাম, একদিন ফেসবুকে নাতাশার প্রশংসা করে, সোনামণি ঘরানার একটি পোস্ট দিতে। উপন্যাসটিতে যে-মোরালিস্টিক এপ্রোচ তলস্তয় ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে কাওরান বাজার হক কোনো কথা বলেন নি। তিনি কথা বলেছেন নাতাশা, যুদ্ধের পর শান্তি, শান্তির পর যুদ্ধ, এসব বাতুলতা নিয়ে।

উপন্য্যাসটির যে-বর্ণনাভঙ্গী, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের ধারাভাষ্যগুলি, সেগুলোর সাথে মিল আছে ‘লা মিজারেবল’-এর। তলস্তয় ১৮৬০ সালের দিকে ইউরোপ ভ্রমণ করেছিলেন, এবং তখন তিনি ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ পড়েছিলেন। আমার ধারণা, হুগোর এ উপন্যাস না পড়লে তিনি হয়তো ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ অন্যভাবে লিখতেন, অথবা লিখতেনই না। তলস্তয় কেন নোবেল পান নি, তার একটি কারণ হতে পারে হুগো আর শোপেনহাওয়ারের প্রভাব। নোবেল ফাউন্ডেশনের শর্ত হলো— লেখার চিন্তা, বিষয়ের ধরণ, এবং বর্ণনাভঙ্গী অরিজিনাল হতে হবে। তলস্তয় এ শর্ত পূরণ করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না।

তবে তলস্তয়কে যারা অনুকরণ করেছেন, বিশেষ করে তাঁর মোরালিস্টিক এপ্রোচ এবং স্পিরিচুয়ালিটিকে, তাঁদের অনেকেই নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের গদ্যে তলস্তয়ের মোরালিস্টিক এপ্রোচের প্রভাব রয়েছে (যদিও গদ্যের জন্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পান নি, তিনি নোবেল পেয়েছিলেন তাঁর রোম্যান্টিক ধারার কবিতার জন্যে)।

তলস্তয়ের লেখার আরেকটি উপজিব্য ছিলো সত্যের সন্ধান, সার্চ ফর থ্রুদ। এটি সম্ভবত তাঁর ভেতরে, শোপেনহাওয়ার থেকে সংক্রমিত হয়েছিলো। কিন্তু শোপেনহাওয়ার ছিলেন অধার্মিক দার্শনিক, আর তলস্তয় ছিলেন ধার্মিক সত্যসন্ধানী। ফলে আমার ধারণা, তলস্তয় এখানে দর্শনের সাথে ধর্মের একটি গোলযোগ পাকিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ ধর্মের পক্ষ নিয়ে দর্শন চর্চা করা সম্ভব নয়। দর্শন চর্চা করার সময় ত্যাগ করতে হয় ইহকাল ও পরকালের সমস্ত পক্ষ, এবং থাকতে হয় নিরপেক্ষ। অন্যথায় স্বাধীনভাবে সত্যের সন্ধান করা সম্ভব হয় না।

রবীন্দ্রনাথও এরকম গন্ডগোল পাকিয়েছিলেন। তাঁর চতুরঙ্গ উপন্যাসে, শচীশকে প্রথমে নাস্তিক সাজিয়েছিলেন, এবং পরে ধার্মিক করে তুলেছিলেন। তবে শচীশের চাচা, জগমোহনকে নাস্তিকই রেখে দিয়েছিলেন। জগমোহনের বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

“…..ঈশ্বরবিশ্বাসীর সঙ্গে তিনি এই পদ্ধতিতে তর্ক করিতেন—

ঈশ্বর যদি থাকেন তবে আমার বুদ্ধি তাঁরই দেওয়া;
সেই বুদ্ধি বলিতেছে যে, ঈশ্বর নাই;
অতএব ঈশ্বর বলিতেছেন যে, ঈশ্বর নাই;
অথচ তোমরা তাঁর মুখের উপর জবাব দিয়া বলিতেছ যে, ঈশ্বর আছেন। এই পাপের শাস্তিরূপে তেত্রিশ কোটি দেবতা তোমাদের দুই কান ধরিয়া জরিমানা আদায় করিতেছে।”

এখানে আমার আরেকটি ব্যাপার নজরে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে, আর তলস্তয়ের কিংডম অব গড প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এটি পড়েই চতুরঙ্গের শচীশকে একবার নাস্তিক, ও আরেকবার ঈশ্বরপ্রেমী হিশেবে অঙ্কন করেছিলেন।

‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর দৈর্ঘ্য নিয়েও সমালোচনা আছে। অনেকের প্রশ্ন, তলস্তয় যা বলতে চেয়েছেন, তা তিনি আরও কম দৈর্ঘ্যের উপন্যাসে বলতে পারতেন কি না? এজন্য একটি কৌতুকের তৈরি হয়েছে, কৌতুটি এরকম:

কেউ লম্বা আলোচনা শুরু করলে বলা হয়, জনাব, আমি ওয়ার অ্যান্ড পিস শুনতে চাই না, আসল ঘটনা কী সেটা বলুন।

তবে এটি কেবলই কৌতুক, এটিকে আমি সমালোচনা বলবো না। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ একই সাথে ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস, আবার একই সাথে ফিকশোনাল। ইতিহাস আলোচনা করতে লম্বা দৈর্ঘ্যের প্রয়োজন আছে। আর তলস্তয় যে-স্টাইলে তাঁর চরিত্রগুলো এঁকেছেন, সে-স্টাইলে চরিত্র আঁকতে উপন্যাসকে লম্বাই হতে হবে। প্রায় ১৬০ জন বাস্তব মানুষের উল্লেখ আছে উপন্যাসটিতে, আর ফিকশোনাল চরিত্র তো আছে অনেক।

উপন্যাসটির বর্ণনাভঙ্গী খুব বিস্তারিত। তলস্তয় এক্ষেত্রে হুগোকেও ছাড়িয়ে গেছেন। প্রতিটি চরিত্রের চারপাশকে তিনি ছবির মতো এঁকেছেন। বলা যায়, অনেকটা ভিডিওর মতো। এজন্যই উপন্যাসটি এতো দীর্ঘ হয়েছে। যেমন তলস্তয়, উপন্যাসটির দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম পর্বের চতুর্থ অধ্যায়ে, একটি চরিত্রের (নাম: পিয়েরে) বসার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে—

“Pierre was sitting opposite Dolokhov and Nikolay Rostov. As always, he ate greedily and drank a lot. But those close to him could see that a great change had come over him that day. He sat through dinner without saying a word to anyone, glancing around with a scowl and a frown or staring vaguely into empty air while he rubbed the bridge of his nose with one finger……” (আমি উদ্ধৃত করেছি এন্থনি ব্রিগস-এর অনুবাদ থেকে, পৃষ্ঠা ৩৩৪, পেঙ্গুইন ২০০৭ এডিশন।)

কোনো চরিত্রের এরকম বিস্তারিত বর্ণনা, রুশ সাহিত্যে তলস্তয়ের আগে ছিলো না। আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসে প্রকৃতির বর্ণনা দিতে, তলস্তয়ের স্টাইল ব্যবহার করেছেন। যেমন রাজর্ষি উপন্যাসের অষ্টম পরিচ্ছেদ, রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছেন এভাবে—

“গোমতী নদীর দক্ষিণ দিকের এক স্থানের পাড় অতিশয় উচ্চ। বর্ষার ধারা ও ছোট ছোট স্রোত এই উন্নত ভূমিকে গুহাগহ্বরে বিভক্ত করিয়া ফেলিয়াছে। ইহার কিছু দূরে প্রায় অর্ধচন্দ্রাকারে বড়ো বড়ো শাল ও গাম্ভারি গাছে এই শতধাবিদীর্ণ ভূমিখন্ডকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে, কিন্তু মাঝখানের এই জমিটুকোর মধ্যে বড়ো গাছ একটিও নাই……।”

একই স্টাইল একটু ভিন্ন আঙ্গিকে, হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা’ উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। শরৎ চন্দ্রও এর ব্যতিক্রম নন।

‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন রুশ সাহিত্যজগতে একটি না-ঝড়-না-বৃষ্টি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। এটিকে কী বলা যায়, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তখন গোলোস নামে একটি প্রভাবশালী সাহিত্যপত্রিকা ছিলো। গোলোস মন্তব্য করেছিলো— এটি আসলে কী? এটি কি ফিকশন, না কি ইতিহাস? এটিকে আমরা সাহিত্যের কোন শ্রেণীতে ফেলবো?

(বাকি অংশ আগামী পর্বে)

—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *