‘চরকি’ ঘুরবে কেমন?

'চরকি' ঘুরবে কেমন?

চরকি : বাংলাদেশী OTT ইন্ডাস্ট্রিতে সম্ভাবনার নতুন আলো!

মিডিয়া এবং এন্টারটেইনমেন্ট দুনিয়ার ‘নিউ নরমাল’ হচ্ছে OTT প্ল্যাটফর্ম!

শুধুমাত্র 2020 সালে Netflix বাংলাদেশের 2 লাখ+ সাবস্ক্রাইবারদের কাছ থেকে অন্তত দুইশো কোটি টাকার রেভিনিউ জেনারেট করেছে। হাজার কোটি টাকার OTT মার্কেটে নেটফ্লিক্স এর পাশাপাশি ইন্ডিয়ার Hoichoi, Zee5 এর মতো প্ল্যাটফর্মও তাই এখন ছক কষছে কিভাবে আরো বেশি বাংলাদেশীদের সাবস্ক্রাইবার করা যায়।

বাংলাদেশের ড্রামা এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেখানে ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির প্রভাবে প্রায় পথহারা, সেখানে নতুন এই বাংলা ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের সুযোগ রয়েছে নিজস্বতা তৈরি করা, আধিপত্য ধরে রাখা। মিডিয়াস্টার লিমিটেড এর কোম্পানি বা প্রথম আলো ডিজিটাল এর ব্র্যান্ড নিউ ইনিশিয়েটিভ চরকি এই স্বপ্নযাত্রায় মুখ্য ভুমিকা পালন করতে পারে সামনের দিনগুলোতে।

কিন্তু এই কাজটা এত সহজ হবে না। কোয়ালিটি কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এর পাশাপাশি মার্কেটিং এবং competitive strategy তেও অনেক অনেক ইনোভেটিভ হতে হবে, শক্তিশালী হতে হবে।

“Strategy without tactics is the slowest route to victory. Tactics without strategy is the noise before defeat.” – Sun Tzu

এই Business Strategy Case Study তে আমি সদ্য লঞ্চ হওয়া OTT patform ‘চরকি’ কে কেইস স্টাডি ধরে ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রির এনাটমি করবো এবং চরকির বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ইন-ডেপথ এনালাইসি করার চেষ্টা করবো।

চরকি: ফিল্ম, ফান, ফুর্তি

প্রায় তিনবছর ধরে এক্সটেনসিভ মার্কেট রিসার্চ, হিউজ প্ল্যানিং করার পর ‘বাংলা কনটেন্টের রাজধানী’ হবার স্বপ্ন নিয়ে এবং দেশি প্ল্যাটফর্মে বিশ্বমানের বিনোদনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে প্রথম আলো ডিজিটাল এর ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফরম – চরকি।

বহুদিন ধরেই প্রথম আলো বিশ্বের নাম্বার ওয়ান বাংলাদেশি এবং বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট। কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিকে বিশ্বজুড়ে সব প্রিন্ট মিডিয়ার মতো ধাক্কা খাওয়ার আগে প্রথম আলোর প্রিন্টেড কপি সার্কুলেশন ছিল প্রতিদিন 5 লাখ কপি।

ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন এর অংশ হিসেবে হিসেবে প্রথম আলোর অনলাইন পোর্টাল অনেক আগেই যাত্রা শুরু করেছিল। যেটা বিশ্বের 200 টির উপর দেশ থেকে প্রায় 13 মিলিয়ন মানুষ ভিজিট করে, এবং মাসে 300 মিলিয়ন এর উপর পেইজভিউ হয়ে থাকে।

ডিজিটাল এডস্পেসের জায়গাটা প্রথম আলো অলরেডি পুরোপুরি ইউটিলাইজ করে ফেলেছে। সেই সাথে সিংহভাগ মার্কেট শেয়ার থাকার কারণে নতুন মার্কেট শেয়ার পাওয়াও কঠিন।
Video is the future in digital – নতুন ভার্টিকাল চালু করে বিজনেস এক্সপ্যানশন করাটা তাই প্রথম আলোর জন্য ন্যাচারাল স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন।

বেশিরভাগ কোম্পানিই এরকম ক্ষেত্রে ইউটিউবে চ্যানেল খুলে এড রেভিনিউ এর চিন্তা করে। কিন্তু প্রথম আলোর নিজস্ব বিশাল একটা ইউজার বেইজ রয়েছে। সুতরাং ইউটিউবকে আননেসেসারি রেভিনিউ শেয়ার না করে নিজস্ব ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাটা আরেকটি নেক্সট স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন।

এক্ষেত্রে প্রথম আলোর ভিশন হলো একটা ‘Content Ecosystem’ তৈরি করা। আমার অনুমান টেক্সট-ভিডিও এর পর এধরণের আরো মেজর ইনিশিয়েটিভ আমরা দেখতে পাবো প্রথম আলোর কাছ থেকে নেক্সট কয়েক বছরে।

চরকির রেভিনিউ মডেল

চরকির রেভিনিউ মডেল হচ্ছে ১। ফ্রি কন্টেন্টের সময় দেখানো এড এবং ২। এড ফ্রি প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন।

ডিয়ার ব্র্যান্ড প্যাক্টিশনার্স, আমাদের নেটিজেনরা কিন্তু অত্যন্তু অত্যন্ত প্রাইস সেনসিটিভ।
ফ্রি সোশ্যাল মিডিয়া; পাইরেটেড সফটওয়ার – মুভির বদৌলতে আমাদের ধারণা জন্মেছে এগুলো আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি এবং জন্মগত অধিকার!

তাই সাবস্ক্রিপশন প্রাইসিংটা ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের জন্য খুবই খুবই ইম্পর্টান্ট।
চরকি এখানে বিভিন্ন ধরণের সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজের রেখেছে – Half yearly subscription 299/-, Yearly 499/-, Yearly Plus 799/- এবং 30 days starter 50/-.
আমি টেস্ট করার জন্য 799 টাকার Yearly Plus প্যাকেজটিতে সাবস্ক্রাইব করেছি, যেখানে দুইটা ডিভাইসে simultaneously স্ট্রিমিং করা যাবে। (50% কুপন ব্যবহার করার ফলে অবশ্য খরচ পড়েছে 400 টাকা, thanks Amitabh Reza Chowdhury vai)!

চরকির ইন্টারফেইস এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্স
আমার জানা তথ্যমতে চরকি প্ল্যাটফর্মটা ডেভেলপ করেছে বাইরের একটা সেরা কোম্পানিকে দিয়ে। সেই সাথে লোকাল হোস্টিং ব্যবহার না করে Amazon Cloud এর এর সবচেয়ে এক্সপেনসিভ হোস্টিং সার্ভিস ব্যবহার করছে।

অনেক নতুন প্ল্যাটফর্ম অনেক সময় বেশি স্মার্ট হতে গিয়ে UI কমপ্লেক্স করে ফেলে, যেটা Steve Krug ওয়েব ইউজাবিলিটির উপর লেখা তার বিশ্ববিখ্যাত বই ‘Don’t Make me Think’ এ পই পই মানা করে গিয়েছেন।

কিন্তু আমার কাছে চরকির পুরা ইউজার জার্নিটাই খুব স্মুথ লেগেছে। চমৎকার ইউজার ফ্রেন্ডলি ওয়েব ইন্টারফেইস, আমার ব্যবহার করা নেটফ্লিক্স বা হইচই এর মতোই অনেকটা। এপ নামালেও এখনো ব্যবহার করে দেখার সময় পাইনি।

পেমেন্ট মেথডে সব ধরণের MFS এবং Credit Card অপশন আছে দেখলাম, এর ফলে অনেকেই টাকাতে পেমেন্ট করতে পারবেন যেটা নেটফ্লিক্স এ সম্ভব হয় না।

Business Strategy – Porter’s 5 forces in OTT Industry

Michael Porter এর মতে, “The essence of strategy is coping with competition.”

যে কোন একটা ইন্ডাস্ট্রিতে কম্পিটিশন পাঁচটা বেসিক force এর উপর নির্ভর করে।
করপোরেট স্ট্র্যাটেজিস্ট এর গোল হচ্ছে এই ইন্ডাস্টিতে এমন একটা পজিশন তৈরি করা যেখানে কোম্পানি এই ফোর্সগুলোর বিপরীতে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে বা ফোর্সগুলো নিজের কাজে লাতে পারবে।

চলুন আমরা এই পর্যায়ে বাংলাদেশে ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রিতে Porter এর Five Forces Model একটু এনালাইসিস করে আসি।

1.Threat of New Entrants

আমাদের দেশে কোন একটা ইন্ডাস্ট্রি একটু পপুলার হলেই দেখা যায় সবাই ঝাক বেঁধে সেদিকে ছোটে। রাইড শেয়ারিং, ইকমার্স, EduTech, ডিজিটাল এজেন্সি ইত্যাদিতে আমরা এই প্যাটার্নটা দেখেছি, রাইট?
তবে ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রির barrier to entry অনেক হাই – বাজেট, কোয়ালিটি কন্টেন্ট, প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট, টেক, মার্কেটিং সব কিছু মিলিয়ে। তাই অন্তুত ‘একটি ঘর একটি ইকমার্স‘ টাইপ সিচুয়েশন এখানে সৃষ্টি হবে না।

ভিডিও স্ট্রিমিং যেহেতু ভবিষ্যতে অসীম সম্ভাবনাময় সেহেতু দেশের বিভিন্ন মিডিয়া গ্রুপ এবং অন্যরাও এখানে হিউজ রিসোর্স নিয়ে মাঠে নামার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে তীব্র কম্পিটিশিন তৈরি হবার সুযোগ আছে নেক্সট কয়েক বছরে।

2.Bargaining Power of Customers:

যেহেতু বাংলাদেশে পাইরেসির বদৌলতে (!) যে কোন ভিডিও নিমেষেই টরেন্ট থেকে নামিয়ে দেখা যায়, টাকা দিয়ে সাবস্ক্রাইব করাতে বেশিরভাগ নেটিজেনই আগ্রহী নন। এই কারণেই আমাদের OTT প্লাটফরমগুলোকে Watch content with Ad অপশনটা দিতে হচ্ছে।
ইউরোপ-আমেরিকাতে Netflix বা Amazon Prime কে এই অপশন দিতে হয় না।

অপরদিকে হ্যাসল ফ্রি ভাল ভিডিও কন্টেন্ট টাকা দিয়ে কনজিউম করতে অনেকেই আগ্রহী, কিন্তু বাংলা ভাষায় কোয়ান্টিটি এবং কোয়ালিটি দুই জায়গাতেই বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই চাহিদা পূরন করতে পারলেই সেই OTT দাঁড়িয়ে যাবে।

3.Bargaining Power of Suppliers:

ওয়েবসিরিজ বা এই টাইপের কন্টেন্ট তৈরির জন্য খুব নামীদামী তারকা সব সময় প্রয়োজন নেই। আবার অলরেডি বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নতুন সেক্টরে ভাল কাজ করার সুযোগের জন্য হয়তো খুব একটা বেশি চার্জ করতে চেষ্টা করবেন না। একই কথা পরিচালকদের জন্যও সত্য।

তবে OTT প্লাটফরমে অরিজিনাল কন্টেন্ট এর পাশাপাশি নিয়মিত পপুলার কন্টেন্ট আনাটাও গুরুত্বপূর্ণ। নেটফ্লিক্সে 50% এর উপর বেশি ভিউ হয় পপুলার টিভি শো যেমন FRIENDS, Breaking Bad ইত্যাদি। ইন্ডিয়ান বাংলা কন্টেন্ট ওউনাররা নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশী প্লাটফরমে তাদের মুভি-সিরিজ দিতে আগ্রহী হবেন।

ফলে এখানে প্লাটফর্ম এবং সাপ্লায়ারদের bargaining পাওয়ারে একটা ভারসাম্য থাকবে।

4.Threat of Substitute:

বিশ্বজুড়ে ভাষাভাষীর সংখ্যায় বাংলা ভাষা রয়েছে সপ্তম স্থানে। ভিডিও এখন জনপ্রিয় একটা এন্টারটেইনমেন্ট মিডিয়া। ইউটিউবের বিভিন্ন কন্টেন্ট, টেলিভিশন, খেলার চ্যানেল ইত্যাদি হয়তো এন্টারটেইনমেন্ট সাবস্টিটিউট, তবে এগুলো খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বাংলা OTT প্লাটফরমে।

5.Industry Rivalry

Chorki এর বাংলা কম্পিটিটর হিসেবে রয়েছে Bongo, Hoichoi, Zee5 ইত্যাদি।
এদের মধ্যে Hoichoi ওয়েব সিরিজ জাতীয় কন্টেন্ট তৈরিতে বেশ এগিয়ে, তাই চরকির প্রধান কম্পিটিটর হবে তারা। Zee5 এর মাসল পাওয়ার থাকার কারনে তারা ফ্রিতে কিছু বাংলা কন্টেন্ট দিয়ে ইউজার পেতে চাইছে, কিন্তু লং রানে আসলেই যথেষ্ট বাংলা কন্টেন্ট দেবে নাকি কিছুদিন পর হিন্দি দেখাবে এটা দেখার বিষয়।

Hoichoi এর কিছু কন্টেন্ট আমার অত্যন্ত ভাল লেগেছে – যেমন তাকদীর, একেন বাবু, মহানগর এর মতো নিজস্ব কন্টেন্ট, ব্যোমকেশ মুভি এবং সিরিজ, খাদ এর মতো মুভি, অন্যান্য জনপ্রিয় বা ক্লাসিক মুভিগুলো।

Bongo যথেষ্ট জনপ্রিয় হলেও ওয়েব সিরিজ জাতীয় কন্টেন্টে তারা সেভাবে যায়নি। প্যান্ডেমিক এর সময় ‘বাসায় থাকুন, Bongo দেখুন’ শ্লোগান দিয়ে সবার জন্য প্লাটফর্ম ওপেন করে দেয়া তাদের গুডউইল এবং ভিউ দুটোই অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে (“Bangladesh Businss Cases” বইতে এটি ডিটেইলস কেইস স্টাডি হিসেবে রয়েছে)।

তবে কন্টেন্ট টাইপের দিক থেকে চরকি এবং হইচই, Bongo থেকে অনেকটাই আলাদা।
অন্যদিকে গ্রামীনফোনের বায়োস্কোপ বা অন্যান্য টেলিকম কোম্পানির ইউজার অনলি প্লাটফর্মের লিমিটেশন হচ্ছে এগুলো সর্বসাধারণ এর জন্য উন্মুক্ত নয়।

এছাড়া রয়েছে Netflix, কিন্তু বাংলা ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসের জন্য এটা আসলে খুব একটা চিন্তার জায়গা না। আমি নিজে Netflix এ ইংলিশ-হিন্দি-তামিল মুভি সিরিজ দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই হাপিয়ে গিয়ে Hoichoi তে যাই দম নিতে, এখন Chorki এড হলো।

SWOT Analysis of Chorki

OTT ইন্ডাস্ট্রির ডায়নামিকস তো বোঝা গেল, একজন বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট এর কাজ নিজেদের ক্রিটিকাল স্ট্রেন্থ এবং উইকনেসকে খুজে বের করে সেই অনুযায়ী স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা। চলুন এবার আমরা তাই চরকির Strength, Weakness, Opportunity এবং Threat (SWOT) ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করি।

STRENGTH

প্রথম আলো ডিজিটাল এর উদ্যোগ: This is the source of Competitive Advantage for Chorki!

প্রথম আলোর যে ব্র্যান্ড ভ্যালু রয়েছে সেটা এককথায় unparalleled.
নিউজ মিডিয়া হিসেবে তো বটেই, বিনোদন জগত নিয়ে ইন ডেপথ কাভারেজের পাশাপাশি ‘মেরিল – প্রথম আলো পুরষ্কার’ জাতীয় ইভেন্টের কারণে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম আলোর অত্যন্ত প্রভাবশালী।

সেই সাথে খুবই স্ট্রং নেটওয়ার্কিং এবং PR রয়েছে সকল স্তরের তারকা, শিল্পী, পরিচালক এবং ফিল্ম দুনিয়ার প্রত্যেকের সাথেই।
That’s why video streaming platform is the perfect strategic fit for Prothom Alo after winning the world of text content.

অজস্র কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, ডিসট্রিবিউশন এবং ফিডব্যাক থেকে অডিয়েন্স ডিমান্ড এবং সাইকোলোজি সম্পর্কে প্রথম আলো বিশেষজ্ঞ। এমনকি বলা হয় অডিয়েন্সের চয়েজ, স্টাইল, ট্রেন্ড কেও ইনফ্লুয়েন্স করে তারা।

এত বছর ধরে তৈরি হওয়া বিশাল পাঠক বেইজ, পাওয়ারফুল ব্র্যান্ডিং, কোয়ালিটি কন্টেন্ট এবং মার্কেটিং এক্সপেরিয়েন্স প্রথম আলো নেবে কাজে লাগাবে।

Advertising & Promotion:

OTT সাধারণত দুইভাবে মার্কেটিং করা হয় – ১। সরাসরি প্ল্যাটফর্ম এর প্রমোশন এবং ২। কন্টেন্ট এর প্রমোশন।
চরকির পক্ষ হয়ে এই দুইটা কাজই প্রথম আলো তার প্রেজেন্স এবং কানেকশন কাজে লাগিয়ে যেভাবে করতে পারবে, অন্য কোন প্লাটফরম সেটা পারবে না।

উদাহরণস্বরুপ, আপনি হয়তো দেখেছেন লঞ্চিং এর পরের দিন 13 জুলাই প্রথম আলো চারপাতার মলাট করে কভার করেছে চরকি প্লাটফরম এবং কন্টেন্ট গুলোকে।

এবং আমার জানামতে অন্তত 250+ টপ সেলিব্রেটি (ফেইসবুক সেলিব্রিটি নয়) ফেইসবুকে সেদিন পোস্ট করেছে তাদের পাঠানো কাস্টোমাইজড গিফটের ছবি এবং কুপন সহ।
Digital Marketing & Ad Technology:
ডিজিটাল মার্কেটিং এর দুনিয়াতে প্রথম আলোর রয়েছে হিউজ এক্সপেরিয়েন্স। অনলাইনে ভার্সনে এড ইনোভেশন এবং এড স্পেস অপটিমাইজেশন এর মাধ্যমে হাজার হাজার ব্র্যান্ডের প্রমোশন চালাচ্ছে তারা।

Google এর Ad Network বা Ad Exchange পুরোপুরি ব্যবহার না করে নিজেরাই পাব্লিশার হিসেবে কাজ করছে এড রেভিনিউ ম্যাক্সিমাইজ করার জন্য।

Resource Sharing:

চরকি তার CEO রিদওয়ান রনি ভাই এর নেতৃত্বে থাকা নিজেদের কোর টিম এবং রিসোর্স এর পাশাপাশি সরাসরি প্রথম আলোর সকল রিসোর্স যেমন মার্কেটিং, কন্টেন্ট, টেকনোলজি, হিউম্যান রিসোর্স, ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার শেয়ার করতে পারবে।

Investment:

চরকির স্ট্রেন্থ এর আরেকটা জায়গা হচ্ছে ইনভেস্টমেন্ট। বেশ গোছানো ভবিষ্যত পরিকল্পনা দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা বেশ ভাল বাজেট নিয়েই মাঠে নেমেছে। অলরেডি তারা দেশের সেরা পরিচালকদেরকে তাদের ড্রিম প্রজেক্টে কাজ করার স্কোপ করে দিচ্ছে, টেকনোলজির জন্য বেস্ট রিসোর্স হায়ার করছে। কয়েক লাখ টাকার সস্তা নাটক বানানোর চেষ্টা না করে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে ফিল্ম মেকিং এ।

কনটেন্ট ক্লিক করলে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের ইনভেস্টমেন্ট এর অভাব হবে না একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।

WEAKNESS

মাত্রই লঞ্চ হবার কারণে এখন পর্যন্ত উইকনেস নিয়ে সেরকম কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়নি।
গত কয়দিন কিছু অভিযোগ দেখেছি বিভিন্ন গ্রুপে যে চরকি এপ ঠিকমতো কাজ করছে না।
তবে প্রথম দিকে যে কোন প্রজেক্টই টেকনিক্যাল কিছু ইস্যু ফেইস করে, আমার ধারণা এই সমস্যা সাময়িক।

এখন পর্যন্ত রিলিজড কন্টেন্ট যেমন ‘মরীচিকা’ নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখেছি (আমি নিজে এখনও দেখার সময় পাইনি)।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশে ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রি এখনও একদমই নতুন, এবং অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে আমাদের সামনে (যেমন লিগ্যাল, কোয়ালিটি কন্টেন্ট, শিল্পী ইত্যাদি)। আমাদের নিজস্ব প্লাটফর্মগুলোকে তাই বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে এবং সাপোর্ট দিতে হবে।

Don’t compare our day 1 with Netflix’s Day 1000!

OPPORTUNITY

BTRC এর তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে May ‘21 এর শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেট ইউজার রয়েছে 11 কোটি 73 লক্ষ। চলুন দেখি এই নেটিজেন বেইজের জন্য কি কি অপরচ্যুনিটি রয়েছে চরকির সামনে।

Young, Tech-Savvy Population:

বাংলাদেশের OTT প্লাটফর্মে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী হচ্ছে 16 – 35 বছর বয়সী। আমাদের দেশের জনসংখ্যার 62% এর বয়স 35 এর নিচে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম আমাদের দেশে কতটা সম্ভাবনাময়।
বাংলাদেশের OTT প্লাটফর্মে এই মূহুর্তে পেইড সাবস্ক্রাইবার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে Millenials বা Generation Y (জন্ম 1981 থেকে 1996 এর মধ্যে)। ইয়াং প্রফেশনাল বা মিড ক্যারিয়ারে থাকা এই জেনারেশন ভাল কন্টেন্ট পেলে (স্পেশালি ঢাকাতে) পেইড সাবস্কাইবার হবে।

Gen Z (জন্ম 1997 – 2012) এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ফ্রি কন্টেন্ট কনজিউম করে, তবে ইনকাম শুরু হলে তারাও পেইড সাবস্ক্রিপশনে আগ্রহী হবে।

ইনফ্যাক্ট আমি আমার ভাইগ্নাদেরকে (10 এবং 10 বছর বয়স) নিয়ে Hoichoi তে ‘মহানগর’ দেখেছি, Netflix এ FRIENDS এর কিছু পর্ব দেখেছি (কিস বা রোমান্স সীন, ‘F***’ ওয়ার্ড এই সব টেনে দিয়ে ভুজং ভাজং বুঝাতে হয় এই যা প্যারা :p)। সামনের তিন-পাঁচ বছরের মধ্যে এরা OTT প্ল্যাটফর্মের খুব গুরুত্বপূর্ন একটা অডিয়েন্স হয়ে দাঁড়াবে।

আর Generation Alpha তো জন্মই নিচ্ছে হাতে স্মার্টফোন নিয়ে, এদের কথা আপাতত আর না বলি!

অরিজিনাল বাংলা কন্টেন্ট:

ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসে বিশ্বজুড়েই থ্রিলার এবং ড্রামা সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও এই জাতীয় কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে।
খেয়াল করে দেখুন, বাংলাদেশে ‘তাকদীর’ বা ‘মহানগর’ এর মতো হিট সিরিজ কিন্তু আমাদের দেশী কন্টেন্ট, ইন্ডিয়ান না।

চরকি অলরেডি ঘোষনা দিয়েছে 12 মাসে 12 টা সিনেমা মুক্তি দেবে। আমার পাওয়া তথ্য অনুসারে তাদের এই মূহুর্তে অন্তত 46 টির মতো কন্টেন্ট আন্ডার প্রোডাকশনে রয়েছে, এর মধ্যে সিরিজ, শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টারি রয়েছে।

রুচিশীল কন্টেন্ট:

“The essence of strategy is choosing what not to do.” – Michael Porter
চরকির সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে শুধুমাত্র masalla জাতীয় কন্টেন্ট এ না ঝুকে একটু রুচিশীল কন্টেন্ট প্রোভাইড করা।

প্রথম আলো দৈনিক পত্রিকা হিসেবে রুচিশীল কন্টেন্ট তৈরিতে ফোকাস করেছিল, ভিডিও স্ট্রিমিং এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিৎ। এর ফলে একটু রুচিশীল দর্শকদের taste মেটানোর পাশাপাশি নিজস্বতা এবং ব্র্যান্ডিং আরো শক্তিশালী হবে।

তবে ভিডিও স্ট্রিমিং সহ সব কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদেরকে সব সময় একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে – যে কন্টেন্ট আপনি তৈরি করবেন, সেটা যেন আপনার এক্সিসটিং পেইড কাস্টোমারদের চাহিদা অবশ্যই পূর্ণ করে।
Freemium মডেলের ক্ষেত্রে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা ফ্রি কনজিউম করবে তাদেরকে বেশি প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে পেইড কাস্টোমারের কথা ভুলে গেলে বিজনেসে কখনোই সাস্টেইনএবল হবে না।

Always reward your paying customers more than your trial users.

THREATS

বাংলাদেশে যে কোন কন্টেন্ট প্রডিসারদের জন্যই সবচেয়ে বড় থ্রেট হচ্ছে পাইরেসি। কোটি কোটি টাকার সম্ভাবনাময় ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এর জন্য। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিল্পী, লেখক, অভিনেতা সব এই সেক্টগুলোতে জড়িত সকলে। গভর্মেন্টের শক্তিশালী ভূমিকা, ম্যাস পাবলিক এওয়ারনেস ছাড়া এই থ্রেটকে দমন করা প্রায় অসম্ভব।

প্রথম আলোর নিজস্ব টেকনোলজি এবং টুলস থাকার কারনে ফেইসবুক এবং ইউটিউবে পাইরেটেড কন্টেন্ট মনিটর এবং প্রিভেন্ট করতে পারবে, কিন্তু টরেন্টে সেটা করা সম্ভব নয়। যদিও আমার দৃঢ় বিশ্বাস কোয়ালিটি কন্টেন্ট দিতে পারলে সামনের দিনগুলোতে অনেকেই পেইড সাবস্ক্রিপশনের দিকেই ঝুকবে।

OTT Success Recipe: Content and Personalization

ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দুইটা শব্দ হচ্ছে ‘Original Content’.
স্পেশালি আমাদের দেশে আমরা হন্যে হয়ে খুজি লোকাল অরিজিনাল কন্টেন্ট। নেটফ্লিক্সের সর্বোচ্চ 99 million ভিউ পাওয়া অরিজিনাল ‘Extraction’ মুভিতে বাংলাদেশ থাকার কারণে আমরা প্রায় সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম দেখতে (এই টপিকে আমি লিখেছিলাম সেই সময়)।

ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে অনেকে মনে করতে পারেন প্রতিটা কন্টেন্টই গ্রেট বা আউটস্ট্যান্ডিং হতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা সবসময় আসলে গ্রেট কন্টেন্ট পাবার করার আশা করি না, কনজিউম করার চেষ্টাও করি না।

হ্যাঁ, আমি আপনি নিয়মিত বিরতিতে Godfather, Shawshank Redemption, 12 Angry Man, Lord of the Rings টাইপ মুভি কিংবা Game to Thrones, Breaking Bad টাইপ সিরিজ দেখি ঠিকই, কিন্তু সেগুলোকে অকেশনাল গ্র্যান্ড ট্রিট হিসেবেই ধরি।

সপ্তাহে একদিন হেভি বিরিয়ানী হলে বাকী দিনগুলোতে মাছ-মাংস-ভেজিটাবল অকেশনাল ফাস্ট ফুড – জাংক ফুডই সই! তাই রেগুলার binge watch করার জন্য মোটামুটি টানটান উত্তেজনাকর থ্রিলার, ফিল গুড বা লাইট হার্টেড ফানি সিরিজ যথেষ্ট।

নেটফ্লিক্স কিন্তু এই সিক্রেটটা জানে, তারা তাই প্রতিটা মুভি বা সিরিজ সেরা বানাতে চেষ্টা করে না।

একই কারণে নেটফ্লিক্স 5 star রেটিং সিস্টেমও ব্যবহার করে না তাদের প্ল্যাটফর্মে। বরং তারা তাদের এক্সটেনসিভ ডাটা এনালাইসিস, পাওয়ারফুল এলগরিদম এবং লিজেন্ডারি Recommendation Engine ব্যবহার করে আমাদেরকে প্রতিটা কন্টেন্টে আমাদের জন্য personalized percentage match score দেখায়।

নেটফ্লিক্স এর মতে এই রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিন এর ভ্যালু প্রতি বছর $1 billion!

সাকসেসফুল OTT platform গড়ে তুলতে চাইলে তাই কিছু অসাধারণ, বেশিরভাগ ভাল কন্টেন্ট এর পাশাপাশি পারসোনালাইজড কন্টেন্ট বা সাজেশন দেখানোটা most important.

ঘুরুক তবে চরকির চাকা!

আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেগুলোর সদ্বব্যহার করতে না পারার কারণে আমরা বারবার ফিল্ম মিডিয়া জগতে পিছিয়ে পড়েছি। নতুন ভিডিও স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের সামনে সুযোগ আছে নিজেদের একটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার।

আমাদের ব্র্যান্ড প্র্যাক্টিশনার্সদের জন্য কিন্তু এটা একটা অসাধারণ সুযোগ বাংলাদেশী OTT কোম্পানিগুলোর এই যাত্রা শুরু থেকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা। শুধুমাত্র কন্টেন্ট নয়, বরং ওভারঅল ব্র্যান্ডিং, স্ট্র্যাটেজি, মার্কেটিং, কম্পিটিশন সবকিছুই।

চরকির সাথে জড়িত প্রত্যেককেই ধন্যবাদ আমাদের জন্য ভাল কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দেবার জন্য। দর্শকদের প্রতি আহবান পাইরেসিকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমাদের নিজস্ব OTT প্ল্যাটফর্মকে গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহবান একটা উপযুক্ত কন্টেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে একসাথে কাজ করুন।

এই মিনি বিজনেস স্ট্র্যাটেজি কেইস স্টাডিতে তথ্যগত কোন ভুল বা অসংগতি থাকলে শুধরে দেবার অনুরোধ রইলো। চলুন এবার তাহলে আপনার অপিনিয়ন শুনি এবং ডিসকাস করি…

Invest in Social

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *